স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণ বা এনআরসি এবং সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল – এই দুটি আপাত বিতর্কিত বিষয়ই যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তা অনেক আগেই জানিয়েছিল বিজেপির শীর্ষনেতৃত্ব৷ নির্বাচন মরশুমে এনআরসি নিয়ে আবার সরব হলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ৷

বাংলাদেশি মুসলমান অনুপ্রদেশকারীদের যে পশ্চিমবঙ্গে জায়গা দিতে ইচ্ছুক নয় কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার তা আবার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন দিলীপ৷ রাজ্য বিজেপির সভাপতির সাফ কথা, ‘‘দেশটা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েছিল৷ ওপার বাংলা থেকে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের ঢুকতে দেব না৷ থাকতে দেব না৷ এনআরসি-এর মাধ্যমে চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু হবে৷’’

এরআরসি নিয়ে বিজেপির বাড়তি উদ্যোগের কারণ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল যা সংসদে এখনও আইন হিসাবে পাশ হয়নি৷ কী আছে এই নাগরিত্ব বিলে? প্রথমেই বলে রাখা ভালো ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব বিলের সঙ্গে সংশোধিত বিলের বিশেষ তফাত কিছুই নেই৷ বিলে যা আছে, তা যদি ব্যাখ্যা করা যায় তবে বলতে হবে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসা মুসলমানরা যেমন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী, অন্যদিকে ওই তিন দেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্শি, শিখ বা খ্রীস্টানদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হলেন শরণার্থী৷ ভারতের সরকার, প্রতিবেশি দেশ থেকে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেবে৷ কারণ, তাঁরা বিপদের মুখে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন৷

অন্যদিকে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো হবে, কারণ সীমান্তের ওপার থেকে রোজগার বা বাসস্থান খুঁজে পেতে, কিংবা কোনও অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁরা এদেশে এসেছে৷ তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের সংখ্যালঘুরা, যারা গত একবছর ভারতে রয়েছেন বা শেষ ৬ বছর ধরেই এই দেশে রয়েছেন, তারাই নাগরিকত্ব আইনের (বিল আইন হিসেবে পাশ হয়ে যাওয়ার পর) আওতায় নাগরিক হতে পারবেন৷

ফাইল ছবি

অসমে এবং ত্রিপুরায় কেন অশান্তি? অসমে অশান্তির কারণ মূলত ভাষা৷ অসমীয়রা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের বিরোধী৷ তাঁদের কাছে বাংলাদেশিদের ধর্মীয় বিভেদ গুরুত্বহীন৷ মুসলমান বা হিন্দু – কোনও বাংলাদেশিকেই অসমে অনুপ্রবেশ করতে দিতে চায় না অসমবাসী৷ তাঁদের মতে অসমে ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশিরা৷ ত্রিপুরার একটি অংশের মানুষও এই বিলের বিরোধী৷

বিজেপির এনআরসিমুখি প্রচারের পালটা জবাব দিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতমমধ্যেই অসমে সভা করেছেন৷ রাজ্যে প্রতিটি জনসভায় মমতা জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণ বা এনআরসি এবং সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল – এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সরব হচ্ছেন৷ অসমে ৪০ লক্ষ মানুষ এনআরসি-এর তালিকায় রয়েছেন এবং তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত৷ রাজ্যে বিজেপির অনআরসির হুমকিকেও পালটা চ্যালেঞ্জ করে মমতা বলেছেন, দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের ‘এক্সপেয়ারি ডেট’পেরিয়ে গিয়েছে৷ ‘এক্সপায়েরি পি এম মোদী’র বঙ্গে এনআরসি করা হবে না৷

তবে রাজ্য বিজেপি মনে করে অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি অনেকাংশে এক হলেও বেশ কিছুটা আলাদাও৷ অসমে বিদ্রোহের কারণ মূলত ভাষাগত৷ সেখানে অসমীয় ভাষাভাষী মানুষ বাংলা ভাষাভাষিদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে৷ মূল কারণ বেআইনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ভাষাগত সমস্যা হয়নি৷ কিন্তু বাংলাদেশি অনুপ্রদেশকারীরা সীমান্ত এলাকায় অরাজকতা চালাচ্ছে৷

রাজ্যে বিভিন্ন সময়ের শাসকদল ভোটব্যাংকের কারণে তাদের পরিচয়পত্র দিয়েছে৷ থোষমের রাজনীতি শুরু হয়েছে৷ সেক্ষেত্রে দিলীপের বক্তব্য, ‘‘বহুবছর ধরেই বাংলাদেশীরা অবৈধ অনুপ্রবেশ করছে৷ বাংলাদেশ থেকে চুইয়ে চুইয়ে অনুপ্রবেশ বেড়েছে৷ বিশ্বের অনেক দেশেই অনুপ্রদেশকারিদের গুলি করা হয়, বন্দীকরা হয়৷ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আইন রয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গে যেসব রাজনৈতিকদলগুলি রাজত্ব করেছে, তারা অনুপ্রদেশকারীদের ভোটার বানিয়েছে৷’’

অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে পার্টির ধারণাকেও পরিষ্কার করে দিয়েছেন দিলীপ৷ তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে বেআইনি ভাবে আগত মুসনমানদের আমরা অনুপ্রদেশকারী বলি৷ কারণ, দেশটা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে৷ অনেকে বলেছিলেন, তারা হিন্দু দেশে থাকতে পারবে না৷ অন্য দেশ চাই৷

এখান থেকে কিছু মুসলমান জনতা চলে গিয়েছিলেন৷ নিজেদের দেশকে তারা মুসলমান দেশ হিসাবে ঘোষণা করেন৷ ওই দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টানদের উপর ধর্মীয় অত্যাচার বেড়েছে৷ মানসম্মান এবং প্রাণ বাঁচাতে তারা ভারতবর্ষে চলে আসছেন৷ তাঁদের মোদী সরকার ভারতের নাগরিকত্ব দেবে৷