কলকাতা: সারা পৃথিবী জুড়ে যখন দেখা যায় ধর্মীয় হানাহানির ঘটনা তখন এখানের চিত্রটা একেবারে অন্যরকম। অন্যদের চোখে ধর্মীয় সম্প্রীতির নজির গড়ে তোলে কলকাতার এই এলাকা। কলকাতা বন্দরের খিদিরপুর লাগোয়া মুন্সিগঞ্জ নামক এলাকায় হিন্দুদের বারো মাসের তেরো পার্বণে অংশগ্রহন করে একই এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা। উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা এই অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা অন্যদের কাছে সম্প্রীতির নজির গড়ে তুলতে এবং সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিরুদ্ধে মানুষের কাছে শুভ বুদ্ধির বার্তা পৌঁছে দিতে হিন্দুদের পুজো- পার্বনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করেন বলে জানা গিয়েছে।

দুর্গাপুজো হিন্দু বাঙালিদের কাছে শ্রেষ্ঠ উৎসব হলেও যত দিন যাচ্ছে ততই এই উৎসব হিন্দুদের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য ধর্মের মানুষের কাছে সম্প্রীতির উৎসবের আকার নিচ্ছে। ফলে বর্তমান সময়ে বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ উৎসব হিন্দু ছাড়াও মুসলমান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন প্রভৃতি ধর্মের মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে এই আনন্দ উৎসবে অনেক জায়গাতেই দেখা যায় হিন্দুদের পুজোর কাজে সহযোগিতার হাত লাগিয়েছে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষেরাও। যেমনটি কলকাতার মুন্সিগঞ্জের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা করে থাকে।

জানা গিয়েছে, এই পাড়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে হিন্দুদের দুর্গা পুজো, কালি পুজোর আনন্দ তাঁদের পবিত্র ঈদের মতই সমান। ফলে বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণের আনন্দ ভাগ করে নিতে মুন্সিগঞ্জের মুসলিম মা-ভাই, বোনেরা হিন্দুদের শারদোৎসবে সামিল হয়। খুব জাঁকজমক করে না হলেও তিন রাস্তার মোড়ে বাঁশ দিয়ে বাঁধা হয় ওদের সাদামাটা প্যান্ডেল। তাতে বাহুল্য খুব একটা নেই বললেই চলে। শুধু তাই নয়, পুজোর কদিন আগে প্যান্ডেল তৈরি করা হয় এবং তার পাশাপাশি চলে দুর্গাপ্রতিমা গড়ার কাজও।

সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট সলমান সর্দার ,উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল বিরাট হাঁ করে থাকা দুর্গার বাহন সিংহের মুখের মধ্যে দিয়ে ভেতরে কিছু দেখা যায় কিনা। দুর্গাপুজো নিয়ে ছোট্ট সলমনকে জিজ্ঞাসা করতেই সে জানায়, এই দুর্গাপুজোর সময় তাঁদের খুব মজা হয়। তারা সবাই পুজোর দিনগুলিতে একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাই বলে জানা গিয়েছে। সঙ্গে চলে ফুচকা আইসক্রিম খাওয়া এবং দোলনায় চড়া। এইভাবেই আনন্দ করতে করতে তাঁদের পুজোর দিনগুলি কেটে যায় বলে জানিয়েছে ছোট্ট সলমন।

জানা গিয়েছে, ছোটবেলা থেকেই হিন্দুদের এই দুর্গা পুজোকে নিজেদের পুজো বলে ভাবতে শিখেছে ছোট্ট সলমনেরা। তেমনই এই পুজোকে নিজেদের পুজো বলে মনে করেন পাড়ার অন্যান্য সবাই। পুজো কমিটির প্রধান প্রেমনাথ সাহা জানিয়েছেন, তাঁদের পাড়ার এই পুজো ষাট বছর ধরে এভাবেই হয়ে আসছে। প্রেমনাথ বাবু আরও বলেন, ‘আমাদের মামা, দাদাদের দেখেছি সকলে মিলে দুর্গাপূজা-কালীপুজো -ঈদ-মহররম পালন করতে। তিনি আরও বলেন সেই থেকে তারাও একই ভাবে একে অপরের আনন্দ উৎসবে সামিল হন। জানা গিয়েছে, তাঁদের জুনিয়ার যারা এখন বড় হয়েছে, তারাও এখন পুজোর কাজে হাত লাগাতে এগিয়ে আসে। চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে ঠাকুর নিয়ে আসা, ভাসান দেওয়া সহ পুজোর দিনগুলিতে বাকি কাজকর্মে – একে অপরকে সাহায্য করতে সব কাজ মিলে মিশে করতে দেখা যায় এই এলাকার হিন্দু মুসলিম ভাই-বোনদের।

পাশে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিলেন পূজার আরেক উদ্যোক্তা শেখ বাবু। এগিয়ে এসে বললেন, “ঠাকুর নিয়ে আসতে যাই আমরা’। প্যান্ডেলে ঠাকুর আনা, দেখভাল সবই আমরা হিন্দু ভাইদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে করি। তিনি আরও বলেন, প্রতিমার কাছে যারা পুজোয় বসেন তারা সবাই হিন্দু। কারন, পুজো করতে তো মন্ত্র লাগে আমি তো আর মন্ত্র জানি না বলেন শেখ বাবু।”

তবে শাস্ত্র বা মন্ত্র না জানলেও পূজার ব্যবস্থাপনায় পাড়ার মুসলমান ছেলেরাই সামনের সারিতে। প্যান্ডেল-কর্মীদের কাজ দেখভাল করছিলেন যে কয়েকজন, তাদেরই অন্যতম মুহম্মদ নাজিম। পুজো নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে জানিয়েছে,’আসলে এটা একটি রেডলাইট এলাকা । যেসব মানুষ এখানে থাকেন, বিশেষ করে মহিলারা, তারা কেউ একটা জাত বা ধর্মের নয়। আবার যারা আসেন এ পাড়ায়, তারাও নানা জাত-ধর্মের। তাই তাঁদের পাড়ায় জাতপাত-হিন্দু-মুসলিম ব্যাপারটাই নেই বলে জানিয়েছেন মুহম্মদ নাজিম।। একটা হিন্দু বাড়ির বাচ্চা আর মুসলিম বাড়ির বাচ্চা ছোট থেকেই একসঙ্গে বড় হয় – তারা এই ভাগাভাগিটা ছোট থেকেই দেখে না। আমরাও যেমন ছোট থেকে এভাবেই বড় হয়েছি,” বলছিলেন মুহম্মদ নাজিম। সব মিলিয়ে হিন্দু-মুসলিমরা মিলেমিশে পুজো কাটায় এই পাড়াতে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.