সৌজন্য- সিএনএন

জুবা (দক্ষিণ সুদান): কথিত গো রক্ষার নামে বিশেষ ধর্মাবলম্বীকে মেরে ফেলা হচ্ছে ভারতে৷ গত পাঁচ বছরে এই রকম ঘটনা ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে৷ বিতর্ক চরমে৷ গো রক্ষক বাহিনীর তাণ্ডবের একের পর ঘটনা এসেছে সংবাদ শিরোনামে৷ ভারতে এই অবস্থা তৈরির পিছনে উগ্র ধর্মীয় ভাবাবেগ কাজ করছে বলেই অভিযোগ৷ কিন্তু আফ্রিকার পরিবেশ অন্য৷ সেখানে গো রক্ষায় যারা স্টেনগান বা বন্দুক হাতে তুলে নেন তাঁরা সাধারণ মানুষকে মারেন না৷ তাঁদের লক্ষ্য চোরাশিকারীরা৷ কেউ যদি সেই সম্পদ কেড়ে নিতে আসে তাহলে গর্জে ওঠে রাখালদের বন্দুক৷

উত্তর প্রদেশ সহ বিভিন্ন রাজ্যে কয়েকটি সংগঠনের স্ব ঘোষিত গো-রক্ষার নামে নিরীহদের গণপ্রহারে খুন করা হয়েছে৷ এই চিত্রের উল্টোদিকটা রয়েছে আফ্রিকার দেশ দক্ষিণ সুদানে৷ প্রবল গৃহযুদ্ধ ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই নতুন দেশটির বিখ্যাত পশু সম্পদ হল আনখল ওয়াতুসি নামের বিশেষ গোরু৷ বিরাট শিংয়ের বিপুল আয়তনের এই গোরু শ্রেষ্ঠ গৃহপালিত পশুর তালিকায় পড়েছে৷ আর এই অমূল্য গো সম্পদ রক্ষায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন স্থানীয় মুন্ডারি জাতির রাখালরা৷ কিশোর থেকে বয়স্ক যে কোনও মুন্ডারি রাখালের হাতে থাকে দামি আগ্নেয়াস্ত্র৷ রক্তাক্ত সংঘর্ষের কারণে এসব পাওয়া খুবই সোজা৷

সুদান ভেঙে দক্ষিণ সুদান তৈরির আগে থেকেই রক্তাক্ত আফ্রিকার এই এলাকা৷ মিশর যেমন ‘নীল নদের দান’ ঠিক তেমনই সুদান-কেও নীল নদ জীবন দিয়েছে৷ সেই দেশের তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়নে দক্ষিণ সুদান তৈরি হয়েছে ২০১১ সালে৷ সেই থেকে চলতে আসা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘর্ষে বারে বারে রক্তাক্ত দেশটি৷ তার প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে৷ ফলে আরও বেড়েছে চোরা শিকার৷ তাদেরই লক্ষ্য বিশেষ প্রজাতির অত্যন্ত দুধেল ও দামি গোরু আনখল ওয়াতুসি৷ কম করেও এর একেকটার বাজার মূল্য ৪০০-৫০০ মার্কিন ডলার৷ দুর্ভিক্ষ, সংঘর্ষ, গৃহযুদ্ধে বারে বারে ক্ষতির মুখে পড়া দক্ষিণ সুদানে তাই এই গোরু সোনার চেয়েও দামি৷ সেই মহামূল্যবান গো সম্পদ রক্ষায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাহারা দেন মুন্ডারি রাখালরা৷

সুদানে ছড়িয়ে রয়েছেন এই মুন্ডারি আদিবাসীরা৷ তাঁরা নিজেদের নিয়েই মেতে থাকেন৷ একাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন, নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণা চলছে এদেরই স্বভাব নিয়ে৷ এতে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ সুদানের তীব্র সংঘর্ষময় রক্তাক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে আদৌ চিন্তিত নন মুন্ডারি রাখাল সম্প্রদায়৷ তাঁরা শুধু নিজেদের গৃহপালিত বিখ্যাত আনখল ওয়াতুসি গোরু রক্ষায় মগ্ন৷ মুন্ডারিরা মূলত রাখাল সম্প্রদায়। সর্বদা আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখেন তারা৷ যখন তখন চোরাশিকারি দের সঙ্গে তাদের গুলির লড়াই বেধে যায়৷ তাতে হতাহত হয় দু পক্ষই৷ কিন্তু মাটি কামড়ে লড়াই চালিয়ে যান মুন্ডারি রাখালরা৷

সুদানি এলাকার চোরা শিকারিদের প্রধান লক্ষ্য অতীব মাংসল ও দুধেল গোরু আনখল ওয়াতুসি৷ প্রায় আট ফুট লম্বা ও অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন দুধ দেয় এই প্রজাতির গোরু৷ তার শিংয়ের বাহারও চমকপ্রদ৷ চামড়া বেশ লোভনীয়৷ সবমিলে এই গোরু ধরে ও মেরে বাজারে নিয়ে আনতে পারলেই উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব৷ তাই একে কেন্দ্র করেই মুন্ডারি রাখালদের জীবন চলছে৷ তাঁরা নিজেরা কখনও এই গোরু মারেন না৷ প্রকৃতির এই দানকে প্রাকৃতিকে উপায়েই রক্ষণাবেক্ষণ করেন৷

প্রাণী বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, আনখল-ওয়াতুসি বিশ্বের সবচেয়ে মিষ্টি স্বভাবের গোরু হিসেবে পরিচিত৷ এদের যত্নে কোনও ত্রুটি করেন না মুন্ডারি রাখালরা৷ গবাদি পশুর সাথেই ঘুমিয়ে থাকেন তারা৷ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপায়ে এই গোরুদের পরিচর্যা করা হয়৷ এতে দুধের পরিমাণ বাড়ে৷ আর কেউ যদি সেই সম্পদ কেড়ে নিতে আসে তাহলে গর্জে ওঠে মুন্ডারি রাখালদের বন্দুক৷