সৌমিক কর্মকার : চূড়ান্ত হয়েও হল না চূড়ান্ত৷ ছোট গল্পের সংজ্ঞার মতো মুকুল রায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এভাবেই একটি বাক্যে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে৷ তাঁর বিজেপিতে অন্তর্ভুক্তি নাকি সময়ের অপেক্ষা৷ বৈঠকও হচ্ছে একের পর এক৷ তার পরও চূড়ান্ত হচ্ছে না কোনও কিছুই৷

কেন এই টালবাহানা? নিরুত্তর সবপক্ষই৷ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কেন বিজেপির দিকে তাকিয়ে বসে মুকুল রায়? কেন তিনি নিজের দল গঠন করছেন না? এর উত্তর লুকিয়ে গভীরে৷

পড়ুন: নভেম্বরে বিপ্লব ঘটিয়ে পদ্মে ফুটবে মুকুল

মুকুল রায়কে সকলেই দক্ষ সংগঠক হিসাবে চেনেন৷ ১৯৯৮ সালে তিনি নিজের হাতে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন৷ তার পর সেই দলে যোগদান করেন কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এর পর থেকে মমতাই দলের মুখ৷মমতার উপর ভরসা করেই রাজ্যবাসী তৃণমূলকে ভোট দেন৷ কিন্তু সংগঠনের দায়িত্ব সামলাতেন মুকুল নিজে৷ একেবারে বুথস্তর পর্যন্ত তিনি যোগাযোগ রাখতেন দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে৷ প্রত্যেককে চিনতেন নামেই৷ কোনও গোলমাল, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সবই সামলাতেন একা হাতে৷ ভোটের রণকৌশলও তৈরি করতেন৷ কোন ভোটে কাদের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা আছে, সে বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাঁর পরামর্শই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ৷ তিনিই ছিলেন তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড৷

ফলে এমন একজন হেভিওয়েট নেতার দলে অনেক অনুগামী থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক৷ তিনি যেদিকে যাবেন, সেদিকেই তাঁর অনুগামীরাও যাবেন, সেটাই হওয়া উচিত৷ সেক্ষেত্রে নিজের দল তৈরি করলে মুকুল রায়ের রাজনৈতিক লাভই বেশি হত৷ নির্বাচনের ময়দানে নেমে অন্য যে কোনও দলের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার পথও তাঁর কাছে খোলা থাকত৷

পড়ুন: মুকুল রায় তৃণমূলের গলার কাঁটা: জয়

কিন্তু তৃণমূলের চাণক্য সেই পথে হাঁটেননি৷ বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ত্যাগ করার পর তিনি যোগাযোগ বাড়িয়েছেন বিজেপির সঙ্গে৷ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছেন৷ শনিবার রাতে তিনি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতির সঙ্গেও বৈঠক করেন৷ তার পর মিডিয়াকে এড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়েও যান৷ এর পরও বিজেপির তরফে মুকুলকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা করা হয়নি৷
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এত কিছুর পরও কেন বিজেপির পথ চেয়ে বসে আছেন মুকুল রায়? বিজেপিতে যোগদান নিয়ে টালবাহানা হচ্ছে জেনেও কেন পিছিয়ে আসছেন না? কেন নিজের দল তৈরি করছেন না?

পড়ুন: মুকুলের বিজেপিতে আসার ইচ্ছাপ্রকাশ ফাঁস করলেন বিজয়বর্গীয়

রাজনীতিতে সংগঠনই সবসময় শেষ কথা বলে না৷ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মুখ হয়ে উঠতে হয়৷ যিনি ক্ষমতায় রয়েছেন, তাঁকে ধাক্কা দিতে গেলে তাঁর বিকল্প হয়ে উঠতে হয়৷ আর এটাই বড় বাধা মুকুল রায়ের জন্য৷ কারণ, দক্ষ হাতে এতিদন তৃণমূলের সংগঠন সামলালেও তিনি কোনওভাবেই জননেতা নন৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জনপ্রিয়তায় টেক্কা দেওয়া তাঁর পক্ষে কার্যত অসম্ভব৷ সেক্ষেত্রে নিজের দল গড়লে ভরাডুবী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে৷ যেভাবে ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস গড়ে গোহারান হারতে হয়েছিল প্রণব মুখোপাধ্যায়কে৷ ভোটের ময়দানে নেমে সব আসনেই জমানত জব্দ হয়েছিল তাঁর দলের৷ শেষে কংগ্রেসে ফেরা ছাড়া আর কোনও গতি ছিল না ভারতের সংসদীয় রাজনীতির চাণক্যকে৷ সেটা মুকুল নিজেও ভাল করে জানেন৷

পড়ুন: মুকুল রায়ের পাশে দাঁড়াল বসিরহাটবাসী

মুকুল রায়কে যাঁরা চেনেন, যাঁরা তাঁর রাজনৈতিক গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন তিনি সবসময়ই অঙ্ক কষে পা ফেলেন৷ তৃণমূল ছেড়ে এসে তাই তিনি এমন কিছু করতে চান না, যেখানে তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়৷ জনসমক্ষে হেয় হতে হয়৷ তখন আবার তৃণমূলেই ফিরে যেতে হতে পারে তাঁকে৷ বরং বিজেপি তাঁর কাছে অনেক সেফ জোন৷ বিজেপি জাতীয়স্তরের রাজনৈতিক দল৷ একার কাঁধে তাঁকে সব দায়িত্ব নিতে হবে না৷ নেপথ্যে থেকে তিনি বিজেপিতেও সংগঠন বাড়ানোর কাজ করতে পারবেন৷ ভাল ফল হলে যেমন কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ তাঁর কাছে থাকবে, তেমনই খারাপ ফল হলে সহজেই দায় ঝেড়ে ফেলতে পারবেন তিনি৷
তাই হয়তো বিজেপি ঝুলিয়ে রাখলেও তিনি অপেক্ষায় থাকতে রাজি৷

- Advertisement -