সুমন বটব্যাল, কলকাতা: দাঁতনে নিহত বিজেপি কর্মী বিপিন দাসের শবদেহ নিয়ে মুকুল রায়ের মিছিল ও পথসভায় তাৎপর্যপূর্ণভাবে এলাকার হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সিদুঁরে মেঘ দেখতে শুরু করেছে শাসকদল৷বিষয়টি ভাবাচ্ছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকেও৷দলের একাংশ, অন্তর্ঘাতের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না৷ওডিশা সংলগ্ন প্রান্তিক এই জনপদে বিজেপির কার্যত কোনও রাজনৈতিক অস্তিত্বই নেই৷ তবু কিভাবে এত মানুষ হাজির হলেন- তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে দলীয়স্তরে তদন্তেও নেমেছেন তৃণমূলের নেতৃত্বরা৷শাসকের কপালের ভাঁজ চওড়া করতে ইতিমধ্যেই মুকুলবাবু জানিয়ে রেখেছেন, ‘‘এঘটনাতেই প্রমাণিত বাংলায় গণতন্ত্র নিধন হচ্ছে। এর প্রতিবাদ সবংয়ের উপ নির্বাচনের প্রচারেও তুলে ধরব।’’

কেন চিন্তিত শাসক? একান্ত আলাপ চারিতায় তৃণমূল নেতৃত্বরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন- মৃতদেহের রাজনীতির ‘অস্ত্রে’ বাংলা থেকে সিপিএমকে উৎখাতের নেতৃত্ব ছিলেন এই মুকুল রায়-ই৷ রিজওয়ানুর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলা সাক্ষী থেকেছিল – মৃতদেহের রাজনীতির৷ তারপর সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম থেকে জঙ্গলমহল- যেখানেই বিরোধীদের দেহ পড়েছে সেখানেই সবার আগে ছুটে গিয়েছেন মুকুল রায়৷সুদূর লালগড়, বেলপাহাড়ি থেকে কলকাতায় মৃতদেহ এনে তৎকালীন শাসকের ভাবমূর্তিকে বিড়ম্বনায় ফেলার একাধিক নজিরও গড়েছিলেন তিনি৷স্বভাবতই তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন, জার্সি বদলে বাংলার মাটিতে ‘পরিবর্তনের পরিবর্তন’ কায়েম করতে পুরনো ‘অস্ত্রে’ই শান দিচ্ছেন মুকুল রায়৷

১ ডিসেম্বর রাতে দাঁতনের কাঁটাপাল গ্রামে তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষে মৃত্যু হয় বিজেপি কর্মী বিপিন দাসের৷সোমবার কলকাতায় বিজেপি-র রাজ্য দফতরে তাঁর দেহ আনা হয়। দলের রাজ্য দফতর লাগোয়া চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ কিছু ক্ষণ অবরোধ করেন কর্মীরা। পরের দিন মেদিনীপুর হয়ে বিপিনের দেহ পৌঁছায় দাঁতনে৷ পেট্রল পাম্প থেকে সরাইবাজার কয়েক কিলোমিটার পথ শবদেহ নিয়ে মিছিলে হাঁটেন বিজেপি নেতা মুকুল রায়। সরাইবাজারে পথসভাও হয়। মিছিল ও পথসভায় হাজির ছিলেন প্রায় হাজার ছ’য়েক মানুষ৷ যা দেখে আপ্লুত প্রবীণ রাজনীতিক মুকুলবাবু বলেছিলেন, ‘‘‘আমার ৪০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই জনস্রোত থেকে স্পষ্ট আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে দাঁতনের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে একটি আসনেও তৃণমূল জয়ী হতে পারবে না। সব ক’টি আসনে বিজেপি জয়ী হবে।’’

অতীতে বাম জমানায় এভাবেই মৃতদেহ নিয়ে কলকাতা থেকে জেলা মিছিল, পথসভা করতে দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের প্রাক্তন ‘চাণক্য’কে৷ সিঙ্গুর. নন্দীগ্রামের সুরেই দাঁতনের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিজেপি কর্মীদের মনোবল বাড়াতে মুকুল রায়কে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘কান্নার দিন শেষ। এ বার চোখ দিয়ে জল নয়, আগুন ঝরানোর দিন এসেছে।’’

তা যে স্রেফ কথার কথা নয়, বিপিন দাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই শাসককে বিড়ম্বনায় ফেলতে আগামী ৯ ডিসেম্বর সবং উপ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপি-র বুথ স্তরের সম্মেলন করতে চলেছেন মুকুল রায়৷দলীয় সূত্রের খবর, ওই সভায় মুকুল রায়ের সঙ্গে হাজির থাকবেন দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, এরাজ্যের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয়৷ইতিমধ্যে জেলাস্তরে শুরু হয়েছে তৎপরতা৷কলকাতায় বিজেপি-র দফতরে বসে খুঁটি সাজাচ্ছেন দক্ষ সংগঠক মুকুল রায়ও৷গেরুয়া শিবিরে দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বারে বারে বলছেন, ‘‘রাজনীতিতে ‘দ্বিতীয়’র কোনও স্থান নেই৷ মমতার জমানায় গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূল করা যাচ্ছিল না। তাই আরও একবার বাংলার মাটিতে ‘পরিবর্তনের পরিবর্তন’ কায়েম করে বিজেপিকে বাংলায় প্রতিষ্ঠা করবই৷’’

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এখবর অজানা নয় তৃণমূল শিবিরে৷ অগত্যা, মুকুলের মৃতদেহের রাজনীতির ‘অস্ত্র’ রুখতে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে দলনেত্রীকে বারংবার বলতে হচ্ছে, নিজেরা হাতে আইন তুলে নেবেন না৷

- Advertisement -