নিখিলেশ রায়চৌধুরী: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমেরিকা সফরের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রশাসন কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাকামী জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের নেতা সৈয়দ সালাউদ্দিনকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করেছে৷ একইসঙ্গে তারা আমেরিকায় সালাউদ্দিনের যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভারত ও আমেরিকা উভয় দেশই সন্ত্রাসবাদের শিকার৷ সে কথা মাথায় রেখেই মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপ৷

কাশ্মীরের বুকে সৈয়দ সালাউদ্দিন ও তার জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের উৎপাতের ঘটনা নতুন কিছু নয়৷ কিন্তু এতদিনে তাকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করায় হাসি পাচ্ছে৷ কাশ্মীরের বুকে হিজবুল আর আগের মতো বিপজ্জনক কোনও জঙ্গি সংগঠনই নয়৷ এখন সেখানে আইএসআইএসের মডিউল গড়ে ওঠাই ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ৷ দীর্ঘদিন আগেই সালাউদ্দিনকে ছাপিয়ে সেখানে মাসুদ আজহার, হাফিজ মহম্মদ সঈদের চ্যালাচামুণ্ডারা মারণ-উচাটনের কারবার চালাচ্ছে৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

তাদের বাড়বাড়ন্তে সালাউদ্দিন ও তার জঙ্গির দল প্রায় সাইডলাইনে চলে গিয়েছে৷ এটা ঘটেছে সেই ১৯৮৯ সালে, রুশ-মার্কিন আফগান ছায়াযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই৷ ওই সময় থেকেই, পাক সামরিক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের প্রত্যক্ষ মদতে আল-কায়েদার শাখা সংগঠন হিসাবে কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদ কাশ্মীর উপত্যকায় নতুন করে তাদের অন্তর্ঘাত শুরু করে৷ জেকেএলএফের ইয়াসিন মালিকদের পরবর্তী কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি সালাউদ্দিন সেই সময় থেকেই আইএসআইয়ের অফিসারদের চোখে ব্যাক বেঞ্চার বয়ে রূপান্তরিত হয়৷ এত দিন বাদে সেই ‘দুর্ভাগা’ সালাউদ্দিনকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কোন অশ্বডিম্বটি প্রসব করল, সেটাই বোধগম্য হচ্ছে না৷ একটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা না দিয়ে তারা যদি মাসুদ আজহার ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদে চীনকে আরও বেশি চাপে রাখার প্রতিশ্রুতি দিত, সেটা ভারতের জন্য অনেক বেশি কাজের কাজ হত৷ তা না করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সালাউদ্দিনকে নিয়ে যে হাস্যকর কাণ্ডটি করল তাতে সুকান্ত ভট্টাচার্যর ‘মিঠেকড়া’র সেই কবিতার লাইনটি মনে পড়ে যাচ্ছে : এই নাও ভাই চালকুমড়ো, আমায় খাতির কর/ চালও পেলে কুমড়ো পেলে, লাভটা হল বড়!

তবু আশা করা যায়, সন্ত্রাস দমনের প্রশ্নে মার্কিন কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কিছু না কিছু গোপন বোঝাপড়া হয়েছে৷ সেই বোঝাপড়াটা যদি কাশ্মীর উপত্যকায় নতুন নতুন বুরহান ওয়ানির আবির্ভাব ঠেকানোর জন্য হয়ে থাকে, সেটা ভারতের পক্ষে অবশ্যই মঙ্গলজনক৷ কিন্তু তার থেকেও বড় কথা— ভারতের আরজি মেনে মার্কিন প্রশাসন যদি পাক সামরিক বাহিনীর হর্তাকর্তাদের, বিশেষ করে সেখানকার আইএসআই এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের গলার বকলসটা আরও বেশি করে টেনে ধরে, তার চেয়ে বেশি উপকার অন্য আর কোনও কিছুতেই হতে পারে না৷ এখন আইএসআই এবং পাক মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে লাল চীনের গোয়েন্দা কর্তাদের বোঝাপড়া আগের চাইতে অনেক বেশি গাঢ় হয়েছে৷ তবু, আমেরিকার সিআইএ-কে না জানিয়ে কিছু করতে গেলে যে ভুগতে হবে, সেটা আইএসআইয়ের কর্তারাও যেমন বিলক্ষণ জানেন, ঠিক তেমনই পাক মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মাথাদেরও এটা হাড়ে হাড়ে জানা যে, পেন্টাগনকে কিছু না জানিয়ে করতে গেলে আগামী দিনে তাঁদের ফুর্তি মারা বেরিয়ে যাবে৷ সুতরাং, এই ব্যাপারে যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলাদা করে কথা হয়ে থাকে, তাহলে তার চাইতে ভালো আর কিছুই হতে পারে না৷

এখনও পাকিস্তানের সেনাকর্তা কে হবেন কিংবা আইএসআইয়ের প্রধান কে হবেন অথবা মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স কার হাতে থাকবে, সেটা স্থির হয় সিআইএ-র সদর দফতর ল্যাংলিতেই৷ রাওয়ালপিন্ডিতে নয়৷ সিআইএ-র প্রস্তাবিত নাম পেন্টাগন ঘুরে হোয়াইট হাউসের ছাড়পত্র পেলে তবেই পাকিস্তানে ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র’ যে সেনাবাহিনী সেখানে রদবদল ঘটে৷ এমনিতে বাইরে থেকে যত ভয়ংকরই লাগুক, পাক সেনাবাহিনীর উপরমহলে ক্ষমতার লড়াই এবং রেষারেষি বরাবরের৷ জুলফিকার আলি ভুট্টোকে উৎখাত করতে জেনারেল জিয়া উল-হক যখন সামরিক অভ্যুত্থানের ছক কষেছিলেন, তখন ফোনে তিনি তাঁরই এক সহযোগী পাক সামরিক অফিসারকে পাঞ্জাবিতে বলেছিলেন : বেরাদর, মার না দেই না (ভাই, মেরে দিও না যেন)! সেই অবস্থার হেরফের এখনও ঘটেনি৷ মাঝে বেশ কিছু দিন পাক মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মাথায় কেউ ছিল না৷ তিনজন অফিসার মিলেজুলে কাজ চালাচ্ছিলেন৷ সম্প্রতি একজন দায়িত্ব পেয়েছেন— মেজর জেনারেল নাদিম জাকি মনজ৷ বলা বাহুল্য, হোয়াইট হাউসের গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরেই সেটা সম্ভব হয়েছে৷

সে কারণেই আবারও বলতে হচ্ছে, পাক সামরিক বাহিনী তথা আইএসআইয়ের গলার বকলসটা যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আরও কষে টেনে ধরার প্রতিশ্রুতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দিয়ে থাকে, সেটাই ভারতবাসীর পক্ষে লাভজনক হবে৷ নতুবা, হিজবুল নেতা সৈয়দ সালাউদ্দিনের মতো একটা জিন্দা লাশের উপর মার্কিন খাঁড়ার ঘা মারার কথা ঘোষণা করে ওয়াকিবহাল মানুষজনের কাছে হাস্যাস্পদ হওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ