কলকাতা: ৮০ মিনিটে জুয়ান মেরার গোলার মতো শটটা ক্রসবারে প্রতিহত না হলে মধুরেণ সমাপয়েৎ দেখত উত্তেজক কলকাতা ডার্বি। না, ভাগ্য সহায় ছিল না স্প্যানিশ মিডিওর। ভাগ্য সহায় ছিল না লাল-হলুদের। ইস্টবেঙ্গলকে ২-১ গোলে হারিয়ে আই লিগের প্রথম ডার্বি জিতল মোহনবাগান। দেশোয়ালি কিবুর স্ট্র্যাটেজিতে ঘায়েল হয়ে প্রথমবার কলকাতা ডার্বিতে মাথা নীচু করে মাঠ ছাড়লেন আলেজান্দ্রো।

ম্যাচের সামগ্রিক পরিসংখ্যান নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে বসলে দেখা যাবে ম্যাচের শেষ ২০ মিনিট রাজত্ব করেছে ইস্টবেঙ্গল। আর তাতেই দু’গোলে এগিয়ে যাওয়া ম্যাচ জিততে শেষদিকে কালঘাম ছুটল কিবুর দলের। রবিবাসরীয় যুবভারতীতে প্রথমার্ধ জুড়ে শুধুই মোহনবাগান। মাঝমাঠে ফুল ফোটালেন জোসেবা বেইতিয়া, ফ্রান গঞ্জালেসরা। পাশাপাশি নংদম্বা নাওরেম নামক তারকার জন্ম দিয়ে গেল এদিনের বড় ম্যাচ। বিষাক্ত দৌড়, তুখোড় ড্রিবলে লাল-হলুদ ডিফেন্সকে মাটি ধরালেন এই মণিপুরী। সঙ্গে রক সলিড ড্যানিয়েল সাইরাসের নেতৃত্বাধীন বাগান ডিফেন্সে প্রথমার্ধে এদিন এতটুকু আঁচড় কাটতে ব্যর্থ ইস্টবেঙ্গলের অপেক্ষাকৃত দুর্বল আক্রমণভাগ।

গোকুলাম ম্যাচের একাদশে একটি পরিবর্তন এনে ডার্বির ঘুঁটি সাজিয়েছিলেন লাল-হলুদ কোচ আলেজান্দ্রো মেনেন্দেজ গার্সিয়া। অন্যদিকে অপরিবর্তিত একাদশ নিয়েই বড় ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন কিবু ভিকুনা। ম্যাচের ১৮ মিনিটে লাল-হলুদ ডিফেন্সের ডেডলক ভাঙে মোহনবাগান। বামপ্রান্ত ধরে সাইডব্যাক কমলপ্রীত সিংকে একপ্রকার বোকা বানিয়ে বক্সের মধ্যে ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা জোসেবা বেইতিয়ার জন্য বল সাজিয়ে দেন নাওরেম। গোলরক্ষককে একা পেয়ে ফাঁকা গোলে হেডে বল জড়িয়ে দেন অরক্ষিত বেইতিয়া।

গোল খেয়ে হতোদ্যম লাল-হলুদ খেই হারিয়ে ফেলে। সেই সুযোগে ইনসিওরেন্স গোল তুলে নেওয়ার লক্ষ্যে থাকলেও প্রথমার্ধে আর গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নিতে পারেনি বাগান। তবে জারি ছিল তাদের দৃষ্টিনন্দন ফুটবল। প্রতিটি বিভাগে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিয়ে যুবভারতীতে তখন তরতরিয়ে ছুটছে পালতোলা নৌকো। প্রিয় ক্লাবের সঙ্গে এটিকে’র সংযুক্তিকরণের প্রসঙ্গ ভুলে ‘মোহনবাগান…মোহনবাগান…’ শব্দব্রহ্মে তখন ফেটে পড়ছে গ্যালারি।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটা তুলনায় মন্থর শুরু করে মোহনবাগান। উলটোদিকে ইস্টবেঙ্গল ছিল সেই তিমিরেই। পরিস্থিতি বদলাতে ৫৯ মিনিটে পিন্টুকে তুলে সদ্য দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া এডমুন্ড লালরিনডিকাকে মাঠে নামান আলে। মিনিট তিনেক বাদে চোটের জন্য আশুতোষকে তুলে গুরজিন্দারকে নামান কিবু। ইস্টবেঙ্গল রক্ষণের উপর ফের চাপ বাড়াতে থাকে বাগান আক্রমণভাগ। ৬৪ এবং ৬৫ মিনিটে টানা দু’টি কর্নার আদায় করে নেয় তাঁরা। যারমধ্যে দ্বিতীয় কর্নারটি ইনসিওরেন্স গোল এনে দেয় কিবুর দলকে। প্রথম গোলের মালিক বেইতিয়ার কর্নারে লাফিয়ে নিখুঁত হেড করেন সেনেগাল স্ট্রাইকার পাপা বাবাকার। যার কোনও উত্তর ছিল না লাল-হলুদ রক্ষণের কাছে।

দ্বিতীয় গোল পেয়ে ম্যাচ মোটামুটি নিজেদের দখলে নিয়ে নেওয়া মোহনবাগান ম্যাচের প্রথম ঝটকা খায় ৭২ মিনিটে। প্রতি আক্রমণে সুপার-সাব এডমুন্ডের ডিফেন্স চেরা থ্রু থেকে শংকর রায়কে পরাস্ত করে ইস্টবেঙ্গলকে ম্যাচে ফেরান এসপাদা মার্টিন। গোল পেয়ে হঠাতই উজ্জীবিত ইস্টবেঙ্গলের কাছে ম্যাচের বাকি সময়টা ব্যাকফুটে চলে যায় মোহনবাগান। একের পর আক্রমণে বাগান ডিফেন্স ফালা-ফালা করে দিতে থাকেন জুয়ান মেরা, হাইমে কোলাডোরা। ৮০ মিনিটে মেরার বাঁ-পায়ের দূরপাল্লার শটটা ক্রসবারে প্রতিহত না হলে চলতি টুর্নামেন্টের সেরা গোল হতেই পারত।

একের পর এক আক্রমণ শানালেও ফিনিশিংয়ে দক্ষতার অভাব ম্যাচে ফেরাতে পারেনি ইস্টবেঙ্গলকে। অন্যদিকে ম্যাচের বাকি সময়টা গোলদুর্গ অক্ষত রাখতে সক্ষম হয় মোহনবাগান। শেষমেশ যোগ্য দল হিসেবেই ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়ে তাঁরা। সেইসঙ্গে ৮ ম্যাচে ১৭ পয়েন্ট নিয়ে লিগের মগডালে অবস্থান আরও মজবুত করল সবুজ-মেরুন। অন্যদিকে ৭ ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে লিগের লড়াই থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়ার মুখে ইস্টবেঙ্গল।