জীবনে এমন অনেক কিছু রয়েছে, যার কোনও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। নিজের গতিতেই এগিয়ে চলে৷ ঠিক যেমন এগিয়ে চলেছেন, এই মুহূর্তে ভারতীয় বোলিংয়ের কাণ্ডারি মহম্মদ শামি। তবে আজ আমরা এমন জনের মুখোমুখি হয়েছি, যিনি শামির জীবনের গতিকে আরও তাঁর বোলিংয়ের মতো তরান্বিত করেছেন৷ তিনি হলেন শামির সহধর্মিনী হাসিন জাহান। যিনি স্বামীর অগ্রগতির জন্য নিজের জীবনের গতিপথ বদলে ফেলেছেন। ২৪x৭-এর প্রতিনিধির কাছে অকপটে হাসিন৷

প্রঃ এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম সেলিব্রিটি সদস্য মহম্মদ শামির স্ত্রী হিসাবে নিজের অনুভূতি কেমন?

হাসিনঃ খুব গর্ব বোধ হয়। আরও ভালো লাগে যখন শামি দেশের হয়ে নিজের সেরাটা মাঠে দিতে পারে। ভালো লাগে যখন মাঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত-এ গলা মিলিয়ে মনে মনে কঠিন ম্যাচ জেতার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। সব কিছুই আমাকে আলাদাভাবে সুন্দর অনুভূতি এনে দেয়৷ কর্মসূত্রে অনেক সেলিব্রিটির সঙ্গে কাজ করেছি, তাই শামীকে আমার সেলিব্রিটি মনে হয় না। যদিও অন্যদের জন্য ও নিশ্চই সেলিব্রিটি। আর সেলিব্রিটি নয়, যখন কেউ আমাকে বলে ক্রিকেটার শামির বউ, তখন সত্যিই আমার খুব গর্ব হয়।

আরও পড়ুন: মায়ের অনুমতি না পাওয়ায় কী হল কোহলির!

প্রঃবিদেশে সফরে স্বামীর সঙ্গী হতে কেমন লাগে?

হাসিনঃ দারুণ! এমনিতেই সারা বছর খেলার কারণে আমাদের একসঙ্গে থাকা হয় না। তাই যেটুকু সময় কাছে পাই একটুও সময় নষ্ট না-করে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সময় কাটানোর চেষ্টা করি। সেটা দেশ বা বিদেশ যেখানেই হোক না কেন।

প্রঃতোমার সঙ্গে শামির আলাপ হয় কিভাবে?

হাসিনঃ আমি পেশাদার মডেল ছিলাম। তাই পার্টি আমাদের হতেই থাকত। শামিও ক্রিকেটার হবার সুবাদে পার্টিতে যেত। এরকমই এক পার্টিতে আমাদের আলাপ হয়। তারপর বন্ধুত্ব থেকে প্রেম৷ খুব বেশি দিন আমরা আলাদা থাকতে পারিনি। বিয়েটাও করে ফেলি তাড়াতাড়ি।

প্রঃমডেলিং এলে কেমন করে?

হাসিনঃ বীরভূমের মেয়ে আমি। সরাসরি চাকরী নিয়ে কলকাতায় আসি। আমার হাইট দেখে আমার পরিচিতের ভেতরে অনেকেই বলতেন তুই মডেলিং কেন করিস না৷ একদিন অফিসের একজনও আমাকে একই কথা বলেন৷ তার পর আমিও চিন্তা-ভাবনা শুরু করি। আস্তে আস্তে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ আর তার পরেই কাজ শুরু করি। খুব ভাল কাজ করছিলাম। আমার কাজ ভালো হচ্ছিল৷ মুম্বই থেকেও কাজের প্রস্তাব পেয়েছিলাম। তবে সেটা আর Continue করতে পরিনি৷ কারণ শামির সঙ্গে পরিচয় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমরা বিয়ে করি৷ তারপরেই মেয়ে আয়ারাকে নিয়ে সারাদিনের ব্যস্ততা।

আরও পড়ুন:কোচ বিতর্কে বীরু’র সঙ্গে কথা বলবেন সৌরভ

প্রঃ রক্ষণশীল সমাজ আপনার এই পেশাকে কেমনভাবে দেখেছিল?

হাসিনঃ সমাজের কোনও সংজ্ঞা হয় না। যারা রক্ষণশীল তারা তাই থাকেন। আমার পরিবার শুরু থেকেই আমার পাশে ছিল। আসলে কী জানেন, একজন মানুষের সবথেকে বড় ভরসা তার পরিবার। যেটা শুরু থেকেই আমি পেয়েছি। বিয়ের আগে বাবা-মা আর পরে শামির সাপোর্ট সব সময় আমি পেয়েছি। আমি ছোটো থেকে আধুনিক পোষাক পরতাম। আমার বাবা-মা চেয়েছিলেন আমাকে আধুনিক করে মানুষ করতে৷ তাই ছোট থেকেই আমাকে আঁকা, নাচ শেখানোর পাশাপাশি পড়াশোনাও করিয়েছেন। আমার কোনও কাজে কখনও বাঁধা দেননি। আর বিয়ের পর আমি শামির পরিবারকেও পাশে পেয়েছি।

প্রঃ আপনার পোষাক নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছিল, সেটা যদি একটু বলেন ?

হাসিনঃ হ্যাঁ বিষয়টা আমাদের একটু অবাক-ই করেছিল। আমি বরাবরই একটু মডার্ণ ড্রেস পরতাম। তাই এত ভাবনা মাথাতেও আসেনি। জানতেও পারিনি মিডিয়াতে এত হৈচৈ হচ্ছিল৷ আমাকে উত্তরপ্রদেশ থেকে শামির দাদা ফোন করে জানান৷ তারপর টিভিতে দেখলাম অনেক বড় বড় সেলিব্রিটি এটা নিয়ে তাঁদের মত প্রকাশ করেছেন৷ জাভেদ আখতার সাব, সলমন খান আমাকেই সমর্থন করেছিলেন৷ কয়েকজন বিপক্ষেও বলেছিলেন। কিন্ত আমি ওসব মনে রাখতেও চাইনা। দেখুন কিছু মানুষ থাকবেই যারা সব কিছুতেই মতপ্রকাশ করেন। এই তো কিছুদিন আগেই আমাদের বাড়ির সামনে হয়ে যাওয়া ঘটনাকেও বিতর্কের আকারে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল।

প্রঃ সেলিব্রিটিরা একটু অন্যরকম জীবন যাপন করেন, তোমরা কিন্তু এরকম পাড়ার মধ্যেই সবার সঙ্গে মিশে থাকো…৷

হাসিনঃ আসলে বিয়ের আগে আমি এই পাড়াতেই থাকতাম, পাড়াটা বেশ শান্ত। আমি কাজ থেকে ফিরতাম। অনেকদিনই মড ড্রেসেও একা হেঁটে ফিরতাম, কোনও দিন কোনও বাজে কথা শুনিনি৷ বিয়ের পর তাই এখানের ফ্ল্যাটটা কিনি৷ আর সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে ভালো লাগেই৷

আরও পড়ুন: ক্রিকেটারের সঙ্গে পাক অ্যাঙ্কারের সেলফি এখন ভাইরাল

প্রঃ মেয়েকে কি খেলোয়াড় করতে চান?

হাসিনঃ আমাদের ছোট্ট মেয়ে আয়ারা খুবই স্মার্ট আর চনমনে৷ ওকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন৷ শামি মাঝে মাঝে বলে মেয়েকে টেনিস প্লেয়ার করব। আয়ারা খুবই মিশুকে৷ এই তো সেদিন শ্রীলঙ্কায় ম্যাচের পর পার্টিতে বিরাটকে পর্যন্ত ওর সঙ্গে নাচার জন্য ডেকে আনল। বিরাটও খুব এনজয় করেছে৷

(এর মধ্যেই ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে আয়ারা চলে এল আমাদের মাঝে। হ্যালো বলার ধরন দেখে এটা অন্তত বুঝতে অসুবিধা হল না, যে মেয়ে মায়ের মতনই মিশুকে আর স্মার্ট।)

প্রঃ সামনেই বাঙ্গালির সব থেকে বড় উৎসব দুর্গাপুজো৷ কোনও স্পেশাল প্ল্যান ?

হাসিনঃ আমরা খুবই আনন্দ করি। তবে এবার পুজোর সময় অস্ট্রেলিয়া সিরিজ৷ তাই এখনও সেভাবে কোনও প্ল্যান নেই। বাড়ির কাছেই এক পুজো কমিটি শামিকে উদ্বোধনের জন্য বলেছে৷ এরকম নানা ব্যাস্ততা লেগেই থাকে। পুজোর সময় কলকাতার ফ্লেভারটাই আলাদা।

প্রঃ এবার একটু ক্রিকেটে ফিরছি৷ ক্রিকেট খেলা কেমন লাগে?

হাসিনঃ সত্যি কথা, আমি ক্রিকেটটা একদমই বুঝতাম না৷ Infact এখনও যে খুব ভালও বুঝি তা নয়। তবে এখন ক্রিকেট দেখার থেকেও শামির সাফল্যে খুব আনন্দ পাই। ও উইকেট পেলে চিয়ার করি। দেশে থাকলে মাঠে থেকে খেলা দেখার মজাই অন্যরকম হয়। আবার বিদেশের মাটিতে আরও অনেকের স্ত্রী’রা থাকেন, তাদের সঙ্গে বসে খেলা দেখতে দারুণ মজা হয়।

প্রঃ-ক্রিকেটার শামি না মানুষ শামি, কে বেশী নম্বর পাবে হাসিনের কাছে?

হাসিনঃ– মানুষ শামি একটু বেশী নম্বর পাবে৷ শুধুমাত্র ভালো মানুষ হবার সুবাদে। আর একটা কথা মানুষ শামি শুধুমাত্র আমার কিন্তু ক্রিকেটার শামি দেশের সবার।

প্রঃহাসিন নিজেকে কত নম্বর দিতে চান?

হাসিনঃ নম্বর না আমি মনেকরি শামির সঙ্গে পরিচয় হবার পর থেকেই উপরওয়ালার কৃপায় আমাদের সবকিছু এখনও পর্যন্ত ঠিক আছে। আমি আমার পেশা স্বেচ্ছায় ছেড়েছি উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও। পেরেছি কারণ শামির সাপোর্ট। মেয়ে হবার পর ওই আমার প্রথম অগ্রাধিকার।  সব বিষয় মিলিয়েই আমি আজও স্বাধীন হাসিন জাহান (আবার প্রাণবন্ত হাসি)।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ