সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : ঘরে ঘরে নরেন্দ্র মোদী পৌঁছে গিয়েছেন। কিন্তু তারপর তিনি কি করেছেন? সবজি রফতানকারিরা বলছেন , ‘তাঁদের মুখ থেকে ভাত কেড়ে নিয়েছেন মোদীজি। সঙ্গে কৃষকদেরও ব্যাপকভাবে বিপদে ফেলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।” ফলে ২০১৪ সালের পর থেকে রফতানিকারীদের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে সঙ্গে ক্রমশ ক্ষতি বাড়ছে গ্রাম বাংলায়।

লন্ডনে ভারতের সবজি ফল রফতানি হয়েও ফিরে আসছে। বিদেশ থেকে রিপোর্ট আসছে ভারত থেকে আসা সবজি, ফল অস্বাস্থ্যকর। এতে ব্যাকটেরিয়া থাকছে অনেক বেশি। এখানেই অভিযোগ রফতানিকারিদের। তাঁদের অভিযোগের সুর অনেকটা ‘মারে মোদী রাখে কে?’-র মতো শোনাচ্ছে।

অভিযোগ, ভারত সরকারের হয়ে যে সংস্থা সবজি ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করছে তাঁরা সবজিকে পাস মার্ক দিচ্ছেন। এই নিয়ম চালু হয়েছে ২০১৪ সাল থেকেই। পরীক্ষাগারে পাস করার পরে বিদেশে গিয়ে সেই সবজি ক্লিনচিট পাচ্ছে না। ফলে বিদেশ থেকে ফিরে আসছে সবজি। এরপরেই সবথেকে বড় সমস্যায় পড়ছেন রফতানিকারিরা। যে রফতানি সংস্থার সবজি ভারতীয় ল্যবরেটরিতে পাস করেও বিদেশে আটকে যাচ্ছে তাদেরকে ‘অ্যাপেডা’ বরখাস্ত করে দিচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ শাক সবজি ফল রফতানি সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক অঙ্কুশ সাহা বলেন, “আমরা শাক সবজি উৎপাদন করি না। আমরা বিদেশের চাহিদা মতো সবজি কিনে বিদেশে রফতানি করি। ভারত সরকারের নিয়ম মেনে আমরা দেশে সবজি আগে ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করতে পাঠাচ্ছি। তাদের সবুজ সিগন্যাল পেয়েই তো আমরা সবজি , ফল বিদেশে পাঠাচ্ছি। এরপরে বিদেশে যে টেস্ট হচ্ছে সেখানে সব্জিতে গলদ রয়েছে ধরা পড়ছে মানে কেন্দ্রীয় সরকারের যে পরীক্ষাগার রয়েছে সেখানে ভুল টেস্ট হচ্ছে। আমাদের অভিযোগ ভুল করবে পরীক্ষাগার , ফল ভোগ করব আমরা! এটা কেমন নীতি? সরকার সেই ল্যাবরেটরিকে কেন প্রশ্ন করছে না!”

একইসঙ্গে তিনি জানাচ্ছেন, “এতে আমাদের ক্ষতি তো হচ্ছেই সঙ্গে চাষীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একের পর এক রফতানিকারি সংস্থা বরখাস্ত হওয়ায় তাদের থেকে সবজি ফল কেনার পরিমান কমছে। দেশের অন্য রাজ্যে সবজি বিক্রি করে যে টাকা আয় হয় অনেক বেশি লাভ হয় বিদেশে সবজি রফতানি করতে পারলে। সেটা না হওয়ার ফলে বাংলার অনেক চাষিই চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। মাঠেই সবজি নষ্ট হচ্ছে। অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।” এই বিষয়ে ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোনও ফলাফল হয়নি।

এই সমস্যা শুধু বাংলার নয় এই সমস্যায় পড়ছেন অন্যন্য রাজ্যের রফতানিকারিরাও। মুম্বই রফতানি সংগঠনের প্রধান একরাম হোসেন বলেন, “যা বলেছিল সরকার তার কিচ্ছু হয়নি। ভুল পরিক্ষা হচ্ছে ল্যাবরেটরিতে। কোপ পড়ছে এক্সপোর্টারদের উপর। ফল সব্জির এক্সপোর্ট কমে যাচ্ছে। কৃষকরাও ব্যাপক সমস্যায় আছেন।”

কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকদের আয় বৃদ্ধির জন্য রফতানির উপরে জোর দেওয়ার নেয়। সেখানে কৃষকের আয় দ্বিগুন হবে এমন আশা দিয়েছিল সরকার। রফতানি বৃদ্ধি হলে লাভবান হতে পারে সবজি ও ফল রফতানিকারি সংস্থাগুলি। ২০২২ সালের মধ্যে ভারত সবজি ও ফলের রফতানি বাড়িয়ে ৩০ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার থেকে ৬০ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারকরবে। কিন্তু সে সবের কিছুই হয়নি।

তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালের পর থেকে ক্রমে আয় কমেছে শাক সবজি রফতানিতে ২০১৩-২০১৪ সালে শাক সবজি রফতানি করে ২২ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার আয় হয়েছিল। সেটা কমে এই বছর ৭.৭২ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারে এসে নেমেছে। ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মোট ফলন হওয়া সব্জি ও ফলের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নষ্ট হয় বিক্রি না হওয়ার ফল। ২০১৭ সালে নষ্ট হওয়া সব্জির ও ফলের টাকার অঙ্ক ৪৪০ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার। ভারতের অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

২০১৪ সালে ভারতের আম, পান, বেগুন, করলা, পটলের রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ইউরোপ কমিশন। ২০১৬তে আমের উপর নিষেধাজ্ঞা ওঠে ২০১৭ সালে বাকি চারটি জিনিসের উপরেও নিষেধাজ্ঞা ওঠে। কিন্তু ওই চারটি সবজি, ফল এখনও বিদেশে রফতানি করতে পারছে না ভারত সরকার। এক্ষেত্রেও রফতানিকারিরা আঙুল তুলেছেন অ্যাপেডার দিকেই।