‘ফার্মেসি অব দি ওয়ার্ল্ড’। করোনা বিদ্ধস্থ এই পৃথিবীতে যে এই শব্দটার গুরুত্ব অপরিসীম, তা কে না জানে? তাই ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যখন নিজেদেরকে ‘ফার্মেসি অব দি ওয়ার্ল্ড’ বলেন, আর প্রতিবেশী সব দেশেই নয়াদিল্লি সেরাম ইনস্টিটিউটের কোভিশিল্ড পাঠাতে শুরু করে, তখন বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না এটা আসলে চিনকে পিছনে ঠেলে দেওয়ার কৌশল।

এতদিন বেইজিং গোটা বিশ্বকে বুক ফুলিয়ে বলত, চিন হচ্ছে ‘ফ্যাক্টরি অব দি ওয়ার্ল্ড’। কিন্তু এই কোভিড বিশ্বে যে কারখানার চাইতে ফার্মেসির গুরুত্ব বেশি, সেটা অনুমান করে নিতে তো কোনও জ্যোতিষী হওয়ার দরকার নেই। সেই কারণেই তো বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকলেও এবং চিনের সঙ্গে যতই ঘনিষ্ঠতা থাকুক, তবু নেপালের জন্য সব চেয়ে কাঙ্খিত ছিল ভারতীয় ভ্যাকসিনই।

লিখলেন– সুমন ভট্টাচার্য

কাঠমান্ডুতে তো বটেই, বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপে ভারতীয় ভ্যাকসিন পৌঁছে যাওয়ার পর এবং এইসব প্রতিবেশী দেশের সরকারের উচ্ছ্বাস দেখার পর জয়শঙ্কর দাবি করতেই পারেন যে ভারতই ‘ফার্মেসি অব দি ওয়ার্ল্ড’, প্রতিবেশীদের কাছে সঙ্কটের সময়ের মাসিহা।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে যেখানে চিনই নিয়ন্ত্রকের জায়গায় বসতে চেয়েছে বারবার এবং বিভিন্ন দেশে পরিকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ করে সেই দেশের সরকার এবং জনগণকেও তাঁবে রাখতে চেয়েছে, সেই ভূখন্ডে নয়াদিল্লির এই ভ্যাকসিন কূটনীতি আলাদা তাৎপর্য রাখেই। আমাদের মনে রাখতে হবে নেপালে এবং বাংলাদেশে চিনা ভ্যাকসিন পাঠানোর জন্য বেইজিং বদ্ধপরিকর ছিল, কিন্তু দুটি দেশেই বিভিন্ন নিয়মের গেড়োয় সেই চিনা ‘অনুপ্রবেশ’ হয়নি।

বরং ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ডের সাথে যৌথভাবে যে কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন এনেছে, তাই পৌঁছে গিয়েছে নয়াদিল্লির শুভেচ্ছা দূত হিসাবে। ভারতীয় বিদেশমন্ত্রক সূত্রে খবর এই প্রথম দফাতেই ভারত কূটনৈতিক সৌজন্য হিসাবে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলিতে এক কোটি কুড়ি লক্ষ থেকে দু’কোটি ডোজ পর্যন্ত করনোর ভ্যাকসিন পাঠাবে।

নেপাল, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার মতো ভারতের ঘনিষ্ঠবৃত্তে থাকা দেশগুলিতো বটেই এমনকি মায়ানমার, সেশেলস, আফগানিস্তানেও বিশেষ বিমানে করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন।

নয়াদিল্লির এই ভ্যাকসিন কূটনীতি যে বেইজিংকে যথেষ্ঠ চিন্তায় রেখেছে, তা এমনকি পশ্চিমের সংবাদ মাধ্যমেরও নজরে রয়েছে। ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ বা ওবোর দিয়ে চিন যে এশিয়া এবং আফ্রিকা বিস্তৃর্ণ এলাকায় নিজেদের ‘প্রভুত্ব’ বিস্তার করতে চেয়েছিল, তা এই করোনার কারণে এমনিতেই যথেষ্ঠ ধাক্কা খেয়েছিল।

করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য কতটা চিনের কমিউনিষ্ট শাসকরা গোটা বিশ্বের থেকে লুকিয়ে রেখেছিল তা নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। ইউরোপে, জার্মানিতে বা পূর্বের অষ্ট্রেলিয়ায় আমরা তীব্র চিনা বিরোধী মনোভাব দেখতে পেয়েছিলাম। ক্যানবেরায় যেমন চিনা দূতাবাসের সামনে প্রতিবাদের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তেমনি জার্মানির অন্যতম প্রধান সংবাদপত্র ‘দি বিল্ড’ যে ভাষায় বেইজিংকে আক্রমণ করেছিল, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নজিরবিহীন।

এত সবকিছুর পরেও হয়তো বেইজিংয়ের আশা ছিল যে তারা ভ্যাকসিন দিতে চাইলে সব দেশই সাগ্রহে রাজি হয়ে যাবে। ঠিক যেমনভাবে চিন চড়া সুদে যখন ঋণ দিতো, তখন এশিয়া কিংবা আফ্রিকা অনেক দেশই বাধ্য হতো সেই ঋণ নিতে, কারণ, সেই সব দেশের বেহাল পরিকাঠামোকে যুগোপযোগী করে তোলার জন্য অন্য কোনও ‘গৌরী সেন’ নজরে আসতো না।

‘দাতা’র ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া লাল চিনের শাসকরা ভেবেছিল তাদের পাঠানো করোনার ভ্যাকসিনও সবাই সাগ্রহে নেবে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখার যে অভিযোগে ২০২০তেই চিনকে বিদ্ধ করেছিল, তার থেকে তৈরি হওয়া সন্দেহ যে ২০২১ সালেও বেইজিংয়ের ভ্যাকসিন থেকে এতদিনের ‘গ্রহিতা’ দেশগুলিকে মুখ ফিরিয়ে নিতে প্ররোচিত করবে, তা বোধহয় সিন জিয়াও পিং আন্দাজ করে উঠতে পারেননি।

বেইজিংয়ের কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো আরও অস্বস্তির বিষয় এই সব দেশগুলি ভারতীয় ভ্যাকসিন সাদরে গ্রহণ করেছে। জয়শঙ্করের ট্যুইট, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কূটনৈতিক কৌশল-এই সবের ভিতরে আরও একটি অদ্ভুত তাৎপর্য আছে। ভ্যাকসিন পাঠানোর তালিকায় যে সব দেশগুলি রয়েছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই কিন্তু মুসলিম দেশ।

যেমন বাংলাদেশ, মালদ্বীপ বা আফগানিস্থান বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ। দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে যারা বিভেদের রাজনীতির কথা, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের কথা বেশি করে তুলে ধরতে চান, তার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই কৌশলকে খেয়াল রাখছেন তো?

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।