প্রসেনজিৎ চৌধুরী, ঢাকা: সীমান্তের এপার এপার শব্দের পার্থক্য থাকলেও তৃষ্ণা মেটাতে একই তরল ঢকঢক করে গিলতে হয়। জল-পানি একই শব্দ। কিন্তু সীমান্ত পার হলেই বদলে যায় নাম। তবে নামে কী আসে যায়! আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘিরে বাংলাদেশ সরগরম। আর ঢাকায় আসা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা যে কারণে প্রথমেই নিজের পরিচয়টি প্রকাশ করেন তা হল-জল। ঢাকা বা বাংলাদেশের অন্য কোথাও জল চাইলে সঙ্গে সঙ্গে একগাল হেসে দোকানদার বলবেন-কলকাতা থেইকা আসছেন, নিন পানি খান। থতমত খেয়ে সেই পানি নামক জলটি গিলে নেন আগত দর্শনার্থীরা।

রাতে ঢাকায় নেমে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য সিএনজি (অটো)ভাড়া করলাম। তেষ্টা লেগেছিল, চালককে জলের কথা বলতেই ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে বলে-কলকাতা খেইকা আসছেন। গাড়ি দাঁড় করিয়ে বোতলটা এগিয়ে দেয় রফিক( উঠেই নাম জেনে নিয়েছিলাম )। তা সেই পানি গিলে শান্তি পেয়ে বলি- জল বা পানি একই তো ব্যাপার। একই ব্যাপার। দুটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেনের সংমিশ্রনে তৈরি তরলটি প্রাণী জগতের চরম অপরিহার্য। তবে জল বা পানি দুই বাংলায় বদলে গিয়েছে নামে। এর আন্তর্জাতিক পরিচয় ওয়াটার।

তবে ওয়াটার খাব বললে রফিক হাসত কি রাগত তা জানি না। বাঙালি মুসলিম সংখ্যাগুরুর ভূমিপুত্ররা বাংলা ভাষার দাবিতে রক্ত ঝরিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা ছিনিয়ে এনেছিলেন। উর্দুভাষী পাক শাসক ঝুঁকেছিল। সেই শুরু বাংলাদেশ নামে পৃথক অস্তিত্বের পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া।

১৯৭১ এর ভয়াবহ মুক্তিযুদ্ধ অবসানে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। এই দেশের জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ কখনও পানি ব্যবহার করেছেন বললে বিস্তর গবেষণা হবে। জাতীয় কবি নজরুলের লেখায় কিন্তু বিস্তর অবাঙালি উর্দু শব্দের ব্যবহার আছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, মুসলিম সংখ্যাগুরু বাংলাদেশ পানিতেই স্বচ্ছন্দ। আর হিন্দু সংখ্যাগুরু পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত হয় জল। আবার অদ্ভুতভাবে বাংলাদেশে তুমুল বৃষ্টিতে জমা পানিকে বলা হয় ‘জলাবদ্ধতা’। এই নিয়ে বিতর্ক প্রবল। এই জল না পানি কোনটা ঠিক তার উত্তর খোঁজা কঠিন।

তবে সাধারণ বাংলাদেশিরা কিন্তু বলেন জলে থাকা ফল কী করে ‘পানিফল’ হয় পশ্চিমবঙ্গে? পানির দেশে ‘জলাবদ্ধতা’ আর জল বলা পশ্চিমবঙ্গের ‘পানিফল’ শব্দ প্রয়োগের রীতিমতো দ্বন্দ্বে বেসামাল হতেই হয়। এর পরেও থাকে সেই টোল বা মাদ্রাসার কৃতী পড়ুয়াদের ‘জলপানি’ (বৃত্তি)প্রদান বিতর্ক।

বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, ধর্মীয় সহাবস্থান বজায় রাখতে ‘জলপানি’ শব্দ চালু হয়েছিল। কিন্তু সংস্কৃতে কোথাও কোথাও পানি উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ যা পান করা যায়। আর তারই পরবর্তী-তে হিন্দি উর্দু ভাষায় পানি ব্যবহার হয় শুধু জল পানের ক্ষেত্রে। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যেও পানি বলা রেওয়াজ। তবে বিশুদ্ধ হিন্দিতে জল শব্দের প্রয়োগ হয়। কিন্তু হিন্দিভাষী অথবা উর্দুভাষী মুসলিম বা অ-মুসলিম প্রত্যেকেই রোজকার জীবনে পানি শব্দের ব্যবহার করেন আর সেটা খেয়ে বেঁচে থাকেন।

ফলে যারা ধর্মীয় আবেগে জল ও পানির বিতর্ক খুঁজবেন যারা, তাদের বাধা পেতে হবে। নেহাতই জল ও পানির শব্দ ভিত্তিক প্রচলন যেখানে যেমন, সেখানে তেমন। তবে এই প্রচলন ক্রমে পৃথক পরিচয়কে প্রকট করে তুলছে। ঢাকার সিএনজি চালক রফিকের একটা কথা মনে থাকবে- কী কন ভাই, মোদীও তো পানি বলেন !

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ