সুমন ভট্টাচার্য: বৃহস্পতিবার সকালে খাস কলকাতার বেহালায় মিঠুন চক্রবর্তীর রোড শো বাতিল হয়ে যাওয়ার খবর দেখতে দেখতে মনে হল ‘গোখরো’ কেন তাঁর ফনা তুলে ‘ফিল্ম সার্টিফিকেশন অ্যাপেলাইট ট্রাইবুনাল’ বা এফসিএটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রতিবাদ করছেন না? আশ্চর্যের বিষয় বৃহস্পতিবার সকালে মিঠুন চক্রবর্তী, ওরফে ‘গোখরো’র বিজেপির যে দুজন প্রার্থীর সমর্থনে রোড শো করার কথা ছিল, তাঁরাও দুজনই চলচ্চিত্র জগতের লোক, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় এবং পায়েল সরকার। এই দুজনেও ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘টু’ শব্দটি করেননি। নিজেকে ‘বুদ্ধিমান’ অভিনেতা বলে প্রচার করতে বদ্ধপরিকর রুদ্রনীল ঘোষও বোধহয় ‘সাতে পাঁচে’ না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তাহলে ভারতবর্ষের অন্যতম চলচ্চিত্র তারকা মিঠুন চক্রবর্তী, যিনি নিজে ‘মৃগয়া’ বা ‘তাহাদের কথা’র মতো সিনেমায় অভিনয় করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, তিনিও কি জানেন না এফসিএটি বা ‘ফিল্ম সার্টিফিকেশন অ্যাপেলাইট ট্রাইবুনাল’ উঠে যাওয়ার মানে কি? আর টলিউডের যে সব অভিনেতা-অভিনেত্রী নাকি শুধুমাত্র ‘কাজ করার সুযোগ’-এর জন্য গেরুয়া শিবিরে নাম লিখিয়েছেন, তাঁরাও কি জানেন আসলে কি হারালেন?

আমাদের মনে রাখতে হবে বিজেপি এবার ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে ইস্তাহার তৈরি করেছেন, তাতে চলচ্চিত্র এবং বিনোদন জগতের উপর আলাদা গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এমন কি ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তী সত্যজিৎ রায়ের নামে পুরস্কার চালু করার ঘোষণাও রয়েছে বিজেপির এই অঙ্গীকারপত্রে। বিজেপির হয়ে দাঁড়ানো বিভিন্ন চলচ্চিত্র তারকারা টেলিভিশনে বা সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলে এই ‘কাজ’ করার কথায় বারবার বলেছেন। তাহলে যে সরকার চলচ্চিত্রকারদের কাছ থেকে সেন্সার বোর্ডের কোনও সিদ্ধান্তে আপত্তি থাকলে ‘অ্যাপেলাইট ট্রাইবুনাল’-এ যাওয়ার অধিকারই ছিনিয়ে নিল, সেই সম্পর্কে মুখ খুলছেন না কেন?

জরুরি অবস্থার সময় যখন ‘কিসসা কুরসি কা’ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল এবং ইন্দিরা গান্ধী এবং তাঁর সরকার চলচ্চিত্রকারের স্বাধীনতায় কতটা হস্তক্ষেপ করছেন, সেই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সব দলগুলি সেই নিয়ে সোচ্চার হয়েছিল। অর্থাৎ শিল্পীর স্বাধীনতা বা চলচ্চিত্রকার যা বলতে চায়, তাতে সেন্সার বোর্ডের হস্তক্ষেপ নিয়ে দেশ জুড়ে ঝড় ওঠে। ১৯৮০তে ইন্দিরা গান্ধী এবং কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার পরে এই ‘অ্যাপেলাইট ট্রাইবুনাল’ তৈরি হয়। বুধবারও দেখছিলাম সেন্সার বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান শর্মিলা ঠাকুর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের বারবার বলছিলেন, তিনিও যখন দায়িত্বে ছিলেন, কারও তাঁর সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে ওই ‘অ্যাপেলাইট ট্রাইবুনালে’ যাওয়ার সুযোগ ছিল। ‘কিসসা কুরসি কা’র বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সময়েই এই ট্রাইবুনাল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। গত ৩৮ বছরের ইতিহাসে কত সিনেমা সেন্সার বোর্ডের আপত্তির সঙ্গে সহমত না হয়ে এই ট্রাইবুনালে গিয়েছে এবং সুবিচার পেয়েছে। এই হালফিলের সময়েও হৃতিক রোশনের ‘যোধা আকবর’ বা শাহিদ কাপুরের ‘উড়তা পাঞ্জাব’ ‘অ্যাপেলাইট ট্রাইবুনাল’ থেকেই নিজেদের সিনেমা বার করে আনতে পেরেছিল।

তাহলে কী এমন হল যে এই ২০২১ এর এপ্রিলে কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘অ্যাপেলাইট ট্রাইবুনাল’ তুলে দিতে হল? বলিউড তো বটেই, দক্ষিণের সব চলচ্চিত্রকারও একজোট হয়ে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছেন। জাতীয় পুরস্কার বিজেতা বিশাল ভরদ্বাজ বা হানসাল মেহেতারা এই ঘটনাকে ভারতীয় সিনেমার ‘কালো দিন’ বলেছেন। বামেদের সমর্থক কলকাতার অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রও এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। তাহলে মিঠুন চক্রবর্তী বা রুদ্রনীল ঘোষের মতো ‘চে গুয়েভরা থেকে কমলা হ্যারিস’ পর্যন্ত জানা তারকারা এই নিয়ে চুপ কেন?

কেন্দ্রীয় তথ্য এবং সম্প্রচার মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর কলকাতায় এসে বৈঠক ডাকলে বাংলার চলচ্চিত্র জগতের যাঁরা দৌড়ে সেই আমন্ত্রণে চলে যান, তাঁরাও কেন কিছু বলছেন না? কারণ, তাঁরা তো সবাই বিশ্বাস করেন, এবং বিশ্বাস করেন বলেই যান, যে প্রকাশ জাভড়েকর বাংলা সিনেমার উন্নতি করতে চান। মিঠুন চক্রবর্তী বা রুদ্রনীল ঘোষ কি জানেন যে বিজেপি সরকার কেন্দ্রে আসার পর যে সব সিনেমা, আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে যে সব বাংলা সিনেমা গোয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বা ভারতীয় প্যানেরামায় সুযোগ পায়, সেইসব সিনেমাও দূরদর্শনে দেখানো হয় না, ফলে প্রথা অনুযায়ী ওইসব সিনেমাগুলি দূরদর্শনে দেখানোর সুযোগে যে টাকা পাওয়া উচিৎ, তার থেকে বঞ্চিত হয়।

মিঠুন চক্রবর্তী বা রুদ্রনীল ঘোষের মতো যাঁরা ‘সর্বজ্ঞ’ এবং ‘কাজ’ করার জন্যই গেরুয়া শিবিরে গিয়েছেন, তাঁরা বাংলা সিনেমার প্রতি এই ‘অবিচার’ নিয়ে কোনও মন্তব্য করছেন না কেন? কেন্দ্রের কাছে দরবার করছেন না কেন? ‘অ্যাপেলাইট ট্রাইবুনাল’ তুলে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা নিয়ে গোটা ভারতবর্ষ আলোড়িত, সেই নিয়েই বা এই সেলিব্রেটিরা চুপ কেন?

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।