দার্জিলিং: মিরিকের পূর্ত দফতরের কাছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পের অদূরে বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করল পাহাড়ের নিষিদ্ধ সংগঠন গোর্খা লিবারেশন আর্মি বা জিএলএ৷ মিরিক বাজারে পোস্টার সাটিয়ে বুধবার সন্ধ্যার বিস্ফোরণের দায় নিয়ে বনধ বিরোধীদের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে৷

নতুন করে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন দানা পাকতেই কলকাতা ২৪x৭ ডট কমে জিএলএ সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ তাতে মিরিকে বিস্ফোরণের দায় নেওয়া জিএলএ কেমন করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, তা তুলে ধরা হয়৷

পাহাড়ে পৃথক রাজ্যের দাবি ছাড়া অন্য কোনও আন্দোলন করা যাবে না বলে এদিন সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়৷ পাহাড়ে বনধ বিরোধী আন্দোলন রুখতে জিএলএ’র নয়া পোস্টার উদ্ধারের ঘটনায় গোটা মিরিকজুড়ে ছড়িয়েছে উত্তেজনা৷ পৃথক রাজ্যের সমর্থনে জিএলএ’র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার ঘটনায় বেশ চিন্তায় রাজ্য পুলিশের কর্তারা৷ পোস্টার উদ্ধার ও পাহাড় থেকে জিএলএ নির্মূল করতে বড়সড় অভিযানে নামার প্রস্তুতি শুরু করেছে পুলিশ৷

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে মিরিক বাজারে হাতে লেখা একটি পোস্টার দেখতে পান বাসিন্দারা৷ বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করে পোস্টার উদ্ধারের ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে যায় পাহাড়ে৷ খবর দেওয়া হয় মিরিক থানায়৷ পুলিশ পৌঁছে পোস্টার উদ্ধার করে৷

কিন্তু, পাহাড়ে লাগাতার বিস্ফোরণের ঘটনার প্রায় মাসখানিক পর পৃথক রাজ্যের সমর্থনে জিএলএ’র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার ঘটনায় নতুন করে শুরু হয়েছে প্রশাসনিক উত্তেজনা৷ পাহাড়ে জিএলএ’র উত্থান চিন্তা বাড়িয়েছে পুলিশকে৷ কারণ, গোর্খাল্যান্ড দাবিতে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার ক্যাডার বাহিনী জিএলপি ও নাগা জঙ্গি এনএসসিএন(কে) গোষ্ঠীর কথা আগেই উঠে এসেছে৷ এর পাশাপাশি উত্তরপূর্ব ভারতের আরও একটি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল পাহাড়ের আরও এক বিচ্ছিন্নতাবাদ সংগঠন গোর্খা লিবারেশন আর্মি (জিএলএ)৷ সেই সূত্রে জানা গিয়েছে দার্জিলিংয়ে অস্ত্র পাঠানোর আরও কিছু তথ্য৷

গত ৮ জুন দার্জিলিংয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালীন বিক্ষোভ দেখিয়েছিল মোর্চা সমর্থকরা৷ সেই বিক্ষোভে সামিল হয়েছিল গোর্খা লিবারেশন আর্মি (জিএলএ)৷ পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সঙ্গে মিশে রক্তাক্ত আন্দোলন চালাচ্ছে জিএলএ৷ গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, জিএলএ এবং উত্তর পূর্ব ভারতের জঙ্গি সংগঠন ‘ব্ল্যাক উইডো’ পরস্পর হাত মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ে অস্ত্র আমদানি করেছে৷

কারা এই ব্ল্যাক উইডো ? অসমের জঙ্গি সংগঠন বলতে প্রথমে উঠে আসে আলফা (স্বাধীন) ও বোড়োল্যান্ডের দাবিতে সশস্ত্র পথ নেওয়া এনডিএফবি(সংবিজিৎ) গোষ্ঠীর কথা৷ এই দুই গোষ্ঠীর নাশকতায় বারে বারে রক্তাক্ত হয়েছে অসম৷ এদের পাশাপাশি, ১৯৯৫ সালে পৃথক ডিমাল্যান্ডের দাবিতে অসমেই সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে ডিমাসা ন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোর্স(ডিএনএসএফ)৷ সংগঠনের স্বঘোষিত কমান্ডার ইন চিফ হন জুয়েল গারলোসা৷

মূলত উত্তর কাছাড় জেলা (বর্তমান ডিমা হাসাও) জেলাকে ভিত্তি করেই শুরু হয় আন্দোলন৷ ২০০৩ সালে মিজোরামের জঙ্গি সংগঠন HPC-D ডিমাসা উপজাতির ১৭ জনকে অপহরণ করে৷ পরে তাদের খুন করা হয়৷ নিহতদের স্ত্রী’রা বদলা নিতে চান৷ নিজেদের ব্ল্যাক উইডো বলে দাবি করেন৷ সেই সুযোগে ডিমাসা জঙ্গি নেতা জুয়েল গারলোসা নিজের সংগঠনের নাম রাখেন ব্ল্যাক উইডো৷

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, থাইল্যান্ড থেকে পরিচালিত হচ্ছে ব্ল্যাক উইডো গোষ্ঠী৷ উত্তর পূর্ব ভারতের অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে থাইল্যান্ড থেকেও অস্ত্র সাহায্য পেয়েছে ডিমাসা জঙ্গি সংগঠনটি৷ গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের পিছনে জঙ্গি যোগের প্রমাণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ একইসঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, এত শক্তি ওরা পাচ্ছে কোথা থেকে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে উত্তরপূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি আন্দোলনের সঙ্গে৷

পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে সুবাস ঘিসিংয়ের জিএনএলএফের আন্দোলন মেনে নেয়নি জিএলএ৷ ২০০৪ সালে এই সংগঠন তৈরি হয়৷ তারপর সরাসরি সশস্ত্র পথ নিয়েছিল এই গোষ্ঠী৷ এর জন্য দরকার ছিল অস্ত্রের৷ গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, জিএলএ যোগাযোগ করে ব্ল্যাক উইডো-র সঙ্গে৷ এরপরেই থাইল্যান্ড থেকে পাঠানো অস্ত্র গোপনে ঢুকতে শুরু করেছিল দার্জিলিংয়ে৷ ২০১৩ সালে জিএলএকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইউপিএ সরকার৷ ততদিনে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছে সংগঠনের সিআইএসএফের প্রাক্তন কর্মী শীর্ষ নেতা তথা অজয় দাভাল ও রুদ্র আচারিয়া৷ রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ব্ল্যাক উইডো গোষ্ঠী অন্তত ৩০০ জিএলএ ক্যাডারকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিয়েছে৷

দার্জিলিংকে ঘিরে নতুন করে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন চালাতে গিয়ে জিএলএকে পাশে রাখতে উদ্যোগী হন মোর্চা প্রধান বিমল গুরুং৷ তাঁর নিজস্ব বাহিনী গোর্খাল্যান্ড পার্সোনেল (জিএলপি) ও জিএলএ পরস্পর হাত মিলিয়ে নেয়৷ এই সূত্রে জঙ্গি সংগঠন ব্ল্যাক উইডো-র পাঠানো অস্ত্র পেতে থাকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা৷ ২০১৪ সালে বিমল গুরুংয়ের গাড়ির চালক উমেশ কারমিকে গ্রেফতার করার পরই প্রচুর অস্ত্র আমদানির বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন গোয়েন্দারা৷