সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : পলাশী যুদ্ধের ২৫০ বছর পূর্তি স্তম্ভে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান পিপলস ফোরামের পক্ষ থেকে তাঁর প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ‘পরদেশগ্রাসীদের বিজয়স্তম্ভ নয়, মীর মদনের নাম হোক অক্ষয়’। পলাশীর যুদ্ধের সিরাজের বীর সৈনিক মীর মদনের নাম এ যুগের কতজনের মনে রয়েছে তা বলা মুশকিল , কিন্তু ২৬২ বছর আগে বীর সৈনিকের সমাধির বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। সমাধিক্ষেত্রের সামনে শুধু রয়েছে একটা ফলক। এছাড়া আর কিছুই নেই। অথচ ভারতের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এই মীর মদন।

ফিরে যাওয়া যাক ২৬২ বছর পিছনে। ২২ জুন গভীর রাতে গঙ্গা পার হয়ে পলাশীর আমবাগান ‘লক্ষবাগ’-এ সৈনিকদের নিয়ে এসে হাজির হয় লর্ড ক্লাইভ। ২৩ জুন সূর্যোদয়ের আগেই শুরু হয় যুদ্ধ। নবাবের সেনাবাহিনীর তুলনায় সৈন্যসংখ্যা কয়েক বহু গুন কম কিন্তু তাদের শক্তি ছিল বন্দুক। প্রত্যেকেই পারদর্শী। তবুও ইতিহাস জানে আসল ইংরেজদের বন্দুক নয় সবথেকে বড় তোপ ছিলেন মীরজাফর। সঙ্গ দিয়েছিল রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফরাও। এসবের পরেও ২৩ জুন সকাল আটটায় প্রবল আক্রমন শুরু করেন মীর মদন, মোহনলাল, নবে সিং হাজারীরা। মিনিট ত্রিশের মধ্যেই ইংরেজদের বহু সৈনিক ঘায়েল।

ক্লাইভ সেদিন বুঝে গিয়েছিলেন তার পক্ষে যেই থাক, তার দল আমবাগানে বেশিক্ষণ দাঁড়ালে উড়ে যাবে। তাঁবুতে ফিরে যান দলবল নিয়ে। তিনি পরিকল্পনা করেন হামলা হবে রাতে। কারণ দিনের আলোয় যতটা শক্তিশালী দেশি সেনা, রাতে তারা একেবারেই ‘অন্ধ’। বিদেশে যে সব যুদ্ধ হয় সেই যুদ্ধে তখনই রাতেও যুদ্ধ হত। তাই তাঁর দল এই যুদ্ধে এগিয়ে থাকবে অনেক বেশি। ইংরেজদের পিছু হঠে এগোতে শুরু করে মীর মদনরা। সঙ্গে নাগাড়ে গোলা বর্ষণ। কিন্তু ভাগ্যও সঙ্গ দেয়নি। পলাশীর প্রান্তরে টানা আধা ঘন্টা ঝেঁপে বৃষ্টি নবাবের গোলা বারুদ সব ভিজিয়ে দিল। ইংরেজদের গাড়ি ঢাকা ছিল, তাই তাদের কিছুই হয়নি। বৃষ্টি থামতে মীর মদন ইংরেজ বাহিনীকে ঘিরে ফেলার জন্য সাহস নিয়ে আরও এগিয়ে যান। ইংরেজদের গোলন্দাজ বাহিনী তখনই আঘাত হানে। মুহূর্মুহূ গোলাবর্ষণ। একটা গোলা সরাসরি এসে লাগে সৈনিক মীর মদনের শরীরে। যুদ্ধ ক্ষেত্রেই প্রাণ যায় তাঁর।

বিশ্বস্ত সেনাপতি মীর মদনের মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলেন নবাব সিরাজ। এই সুযোগেই সিরাজকে মীরজাফর বলেন যুদ্ধ বন্ধ করতে । বিধ্বস্ত সিরাজ মেনে নেন। থামেনি ইংরেজ বাহিনী। দিকভ্রান্ত, ক্লান্ত নবাবের বাহিনীকে সহজেই পরাজিত করে ইংরেজরা এবং তারপর থেকে টানা ১৯০ বছরের দাসত্বের গ্লানি সহ্য করতে হয় ভারতকে।

যুদ্ধ শেষে মীর মদনের অনুগত কিছু সৈনিক তার মৃতদেহকে গোপনে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের নিকটে ভাগীরথী নদী তীরবর্তী ফরিদপুর গ্রামে কবর দেন। এখনও সেই ফরিদপুরে ফরিদ খানের সমাধির পাশে শুয়ে আছেন পলাশীর যুদ্ধের অন্যতম সেনানায়ক বীর মীর মদন কিন্তু পাওনা শুধুই অবহেলা।

ছবি – সনাতন দাস(মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ এন্ড কালচারাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটি)