স্টাফ রিপোর্টার : যে বয়সে কাঁধে নেবে বইয়ের ব্যাগ, সেই বয়সে ওরা কাঁধে নিয়ে ফেলেছে সংসার চালানোর গুরু দায়িত্ব। রুটি রুজির তাগিদে অকালে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব।

স্কুল ছুট কমাতে রাজ্যের শিক্ষা দফতর ও কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক চালু করেছে কত নিয়ম। এমনকি ২০০০ সাল থেকে বাধ্যতামূলক চালু হয়েছে সর্বশিক্ষা অভিযান। আছে মিড-ডে মিল ব্যবস্থা। সরকারের এত কিছু প্রচেস্টার পরেও যে স্কুল ছুট কমানো যায়নি।

পূর্ব মেদিনীপুর জেলা। এই জেলায় এখনও বেশিরভাগ বাড়ির বাচ্চা থেকে কিশোর সংসারের অভাব ঘুচিয়ে একটু স্বাছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে স্কুলে না গিয়ে যোগ দিয়েছে অর্থ উপার্জনের কাজে। সকালে বাকি বাচ্চাদের গন্তব্য যখন স্কুল কিংবা টিউশন মাস্টার তখন ওদের গন্তব্য হয় টোটো নিয়ে মেদিনীপুর শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।

পড়াশুনো কীভাবে হবে? এই প্রশ্নে টোটোর ব্রেক কষে নাবালক চালক বলে, ‘ এক সময় পড়াশুনো করতাম। কিন্তু এখন বাড়িতে অভাবের জন্য টোটো নিয়ে বেরোতে হয়’।

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ঠেকুয়া, নন্দকুমার, মহিষাদল, গেঁওখালি সহ একাধিক জায়গায় চোখ রাখলেই দেখা যাবে এই সব নাবালক টোটো চালকদের। যাদের প্রত্যেকেরই বয়স ১৬ আবার কারও কারও ১৭।

যাদের এখন হাই স্কুলের বেঞ্চে বসার কথা তারাই এখন সংসারের ঠেলা সামলাতে বেরিয়ে পড়েছে টোটো নিয়ে। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পড়াশুনোর পাঠ চুকিয়েছে সংসারের ভাত জোগাড়ের জন্য। জেলার বিভিন্ন জায়গাতে এই একই চিত্র ধরা পড়ছে দিনের পর দিন তবুও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও হেলদোল নেই প্রশাসনের।

দিন দিন বেড়ে চলেছে এই স্কুল ছুটদের সংখ্যা। সর্বশিক্ষা অভিযানের পাশাপাশি রাজ্য সরকার স্কুলছুট কমাতে চালু করেছে আরও একাধিক কর্মসূচি। যেমন, সমস্ত সরকারি স্কুলে প্রাক- প্রাথমিক থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত চালু করা হয়েছে মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা। এছাড়াও সরকারি স্কুলে পড়তে আসে অনেক দুঃস্থ পড়ুয়া,

তাদের পড়াশুনো যাতে মাঝ পথে থেমে না যায় তার জন্য চালু আছে স্কলারশিপ ফ্রিতে ব্যাগ, বই, খাতা এবং স্কুল ড্রেস এবং কেডস দেওয়ার বন্দোবস্ত। এত কিছুর পরেও যে, গ্রামাঞ্চলের অনেককেই স্কুল মুখ করা যায়নি তা মানছে প্রশাসন।

যে হারে স্কুলছুট পড়ুয়াদের সংখ্যা বাড়ছে এবং তাদের নাবালক বয়সেই পড়াশুনো ছেড়ে যে ভাবে কর্মমুখী হয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে, তাতে আগামী দিনে শিক্ষা সমাজের কত শতাংশ মানুষের কাছে গিয়ে পৌঁছাবে সেটাই এখন ভাবনার মূল বিষয়।

অনেকের যুক্তি, বর্তমান সময়ে দেশের বেশিরভাগ ছাত্র ও যুবসমাজ ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দিশেহারা। তার ফলেই অল্প বয়সে রোজগারে নামছে নাবালকরা। এই ভাবেই রোজ বেড়ে চলেছে টোটো চালকের সংখ্যা।

মহিষাদল রাজ কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক হরিপদ মাইতি জানান, ‘ আজকের যুব সমাজ লক্ষ্য ভ্রষ্ট, তাঁদের চোখে আজ আর নেই নতুন কোনও স্বপ্ন। ভবিষ্যতের ভাবনাও তাদের কাছে স্বচ্ছ নয়, তাঁদের চারিদিকে সকলের মধ্যে যে অর্থলোলুপতা রয়েছে সেটাই তাঁদের চিন্তা ভাবনাকে গ্রাস করে ফেলছে, যার ফলে তারা নিজেদের জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেরাই টাকার পিছনে ছুটছে ‘।