“রাস্তাই রাস্তা দেখাবে” শুধুমাত্র এইটুকু বিশ্বাস অবলম্বন করেই কি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া যায়? ভাইরাস সংক্রমণে জর্জরিত পরিস্থিতি এটাই দেখিয়েছে যে, হ্যাঁ যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই বিশ্বাস থেকে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি কর্মসূচি নিরূপণ করবে, কিন্তু এই মিছিল তো কোনও রাজনৈতিক মিছিলের বার্তা বহন করে না। তাহলে এই নিরন্ন পরিযায়ী শ্রমিকদের পথ চলা কী বার্তা বহন করছে? আসুন সেই দিকে নজর রাখি।

অরিন্দম লাহা, বিভাগীয় প্রধান, বাণিজ্য বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্লেষণে উঠে আসছে, পরিযায়ী শ্রমিকদের অন্তহীন যাত্রা শুধুমাত্র একটি বার্তা বহন করছে না। জীবন, জীবিকা, ভাইরাস সংক্রমণের ভয়, সামাজিক সুরক্ষার অভাব – এইরকম অসংখ্য বার্তাবাহক এই মিছিল। “জীবনের জন্য জীবিকা” তো আমরা সবাই জানি আজ দেখছি “জীবিকার জন্য জীবনের” সমর্পণ। সমস্যা তো আমরা সবাই জানি, এখন একটু সমাধানের রাস্তাটা খোঁজা যাক।

কী সেই পথ ? ভারতের মতো জনবসতিপূর্ণ দেশে ১২৫ কোটি আধারকার্ড পৌঁছে দেওয়া সত্যিই একটি সাফল্য। বর্তমানে আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য যোজনা, সর্বশিক্ষা যোজনা, সমন্বিত শিশু উন্নয়ন যোজনা (ICDS) সবই তো সামাজিক সুরক্ষার নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। গতবছর ৪২০০০ পরিযায়ী জনসংখ্যাকে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের মাধ্যমে অন্য রাজ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুবিধা দিতে পারা গেছে। এই সাফল্যকে অবলম্বন করে আমরা কি সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোটিকে একটু আঁটোসাঁটো করতে পারিনা? শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোটিকে সর্বজন গ্রাহ্য করার জন্য প্রয়োজন একটি সংহত সরকারি তথ্য ভান্ডার।

সর্বশেষ পাওয়া Periodic Labour Force Survey (2017-18) থেকে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বলা যায়, নিয়মিত আয় আছে এরকম অ-কৃষি পেশায় নিযুক্ত শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ৭১% মানুষের কোনও লিখিত কাজের চুক্তি নাই। প্রায় অর্ধেক মানুষই সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নেই। আর যাদের নিয়মিত আয় নেই? তাদের সামাজিক সুরক্ষার বর্তমান পরিস্থিতিটা সহজেই অনুমেয়।

যাই হোক, পরিযায়ী জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান পাওয়ার জন্য তো আমাদের নির্ভর করতে হয় ৯-১০ বছর আগে পাওয়া তথ্যের উপর। ২০১১ সালের জনগণনা, ২০০৭-০৮ সালের NSSO রিপোর্ট, ২০১১-১২ সালের India Human Development Survey, ২০১১ সালে জনগণনার তথ্যের উপর উপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক সমীক্ষা (২০১৬-১৭) পরিযায়ী শ্রমিকের একটি বাস্তবসম্মত চিত্র প্রকাশ করে।

এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যাওয়া এরকম পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা মোটামুটি ৬ কোটি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মিডিয়া সংস্থা রয়টার্সের মতে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যাটা এই সময় মোটামুটি ১০ কোটির ধারেকাছে হতে পারে। এরা মূলত বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড,রাজস্থান, ওডিশা থেকে গিয়ে দিল্লি, গোয়া, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও কর্নাটকে বসবাস করেন। এছাড়াও তথ্যে উঠে আসছে যে দক্ষিণ ভারত ক্রমশ পরিযায়ী গন্তব্যস্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই আকর্ষণীয় গন্তব্যস্থলগুলি ক্রমশ করোনা হটস্পট হিসাবে পরিগণিত হওয়ায় সংক্রমনের ভয় আরও বেশি প্রকট হচ্ছে। যাই হোক, এখন তারা ঘরে ফেরার জন্য যেসব তথ্য সরকারকে জমা দিচ্ছে সেটাও তো একটা ভবিষ্যৎ গবেষণার তথ্য ভান্ডার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তার ওপর ভিত্তি করে তো আমরা সামাজিক সুরক্ষার স্থানান্তরণ (social security portability) ব্যবস্থার একটি সুচিন্তিত নীতি প্রণয়ন করতে পারি। তার জন্য চাই একটি জাতীয়তাবাদী মনোবৃত্তি।

শুধু জাতীয়তাবাদী মনোবৃত্তি ধারণা থেকেই একটি আইন প্রণয়ন করলে কি ফল মেলে? অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে সামাজিক সুরক্ষার ব্যাপারে আইনত রক্ষাকবচ (Unorganized Workers Social Security Act, 2008; Social Security Bill, 2019) পরিযায়ী শ্রমিকদের ব্যাপারে স্পষ্ট দিশা দেখাতে পারেনি।

তাই সর্বপ্রথম দরকার, মধ্যপ্রদেশ সরকারের “সমগ্র –পোর্টাল” এর ন্যায় সব রাজ্যে একটি পরিবার ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার তথ্যভান্ডার তৈরি করা, যা থেকে সকল সামাজিক সুরক্ষা প্রাপ্তির একটি হিসাব পাওয়া যায় । তাহলেই আমরা ভুল ত্রুটি যথা সম্ভব এড়িয়ে শ্রেণীবদ্ধ লক্ষ্য যুক্ত সামাজিক সুরক্ষা নীতি (categorical targeting- a targeted universal basic income scheme) কথা ভাবতে পারি। সীমিত সরকারি অর্থসংস্থানের মধ্যে থেকেও অসংগঠিত পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য এটি প্রণয়ন করা যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী ২০ লক্ষ কোটি আর্থিক ঘোষণা কি এই ব্যবস্থা প্রয়োগের ইঙ্গিতবাহী? ১০ কোটি পরিযায়ী শ্রমিককে মাথাপিছু এককালীন ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হলেও আর্থিক প্যাকেজের ৫০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। যদিও এই ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনও ঘোষণা করা হয়নি। এখনো পর্যন্ত পরিযায়ী শ্রমিকরা যা সরকারি সুবিধা পেয়েছে, তা মূলত প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ যোজনা, নির্মাণ শ্রমিক উন্নয়ন তহবিল, ও সাম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কেয়ার তহবিলর মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সরকারি গণবন্টন ব্যবস্থায় “এক দেশ এক কার্ড”ব্যবস্থাটি জুন মাস থেকে পূর্ণ ক্রমে কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়, তবে এখনো পর্যন্ত ১৭ টি রাজ্য এই ব্যবস্থার বাস্তবায়নের পক্ষে সম্মতি জানিয়েছে ।যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করছে যে ১৭ টি রাজ্যে এটি অস্থায়ীভাবে চালু হয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তব মাটিতে দাঁড়িয়ে তার প্রভাব খুব একটা চোখে পড়ছে না। আর যেসব রাজ্যগুলি এখনো সম্মতি জানায়নি তাদের এখন বোঝা উচিত এই ব্যবস্থার প্রধান সুবিধা প্রাপক গোষ্ঠী হল এই শ্রমজীবী পরিযায়ী মানুষেরাই।

আর প্রান্তিকস্তরের মানুষেরা সরকার বলতে তো বোঝে তার নিকটবর্তী নির্বাচিত দলের পরিচালিত গণতান্ত্রিক কাঠামোটিকে। সেই দিক থেকে দেখলে রাজনৈতিক লাভটা তো রাজ্য সরকারের হওয়ার কথা। ১০০ দিনের কাজের বাস্তবায়নের রাজনৈতিক লাভটা তো বিভিন্ন রাজ্য সরকারের হয়েছিল- তদানীন্তন কংগ্রেস পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের তো নয়। তাই আসুন সব রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে এই ব্যবস্থা সফল রূপায়ণ আর এক পা এগিয়ে আসি।

সর্বশেষে, আসুন আমরা এই মহান মে মাসে মেহনতী মানুষের জন্য একটি নূতন সামাজিক সুরক্ষা যোজনা উপহার দিই। প্রতিবেশী রাষ্ট্র চিন দেখিয়েছে কীভাবে এই স্থায়ী পরিযায়ী শ্রমগোষ্ঠী একটি রাষ্ট্রের শিল্প গঠনে মূল ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এই পরিযায়ী শ্রম গোষ্ঠীর একটি বড় অংশই স্বল্পস্থায়ী হিসাবে থেকে গেছে। সামাজিক সুরক্ষা রক্ষাকবচ এদের স্বল্পস্থায়ী থেকে দীর্ঘমেয়াদী পরিযায়ী হিসাব উন্নীত করতে পারে। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি রাজ্যে গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলের মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ থাকবে। সামাজিক সুরক্ষা ব্যতীত তারা কি আর অন্য রাজ্যে পাড়ি দেবে? করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই প্রশ্নের মধ্যেই যে উত্তরটি লুকিয়ে আছে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ