সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ছেলে ‘বিপথে’ যাচ্ছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারছে পরিবার। সর্বক্ষণ নজরে রাখা হচ্ছে। এসবের মাঝেই ছেলে হঠাৎ একদিন নিরুদ্দেশ। বাবার কানে খবর আসছে সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ছেলে ধর্ম পরিবর্তন করবে। এমন ঘটনা নিয়ে কলকাতায় হইহই পড়ে গিয়েছে। তবু ছেলের দেখা নেই। যেদিন খোঁজ মিলল সেদিন ছেলে ‘হিন্দু’ ধর্মের পাপ মুক্ত। হ্যাঁ , তৎকালীন সমাজের একের পর এক ঘটনা এতটাই হিন্দু ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করেছিল মধুসূদনের মনে। অতঃপর মাইকেল মধুসূদন।

হিন্দু কলেজের অসামান্য প্রতিভার অধিকারী মধুসূদন দত্ত। তার এমন ধর্ম পরিবর্তন রুখতে বাবা লাঠিয়াল বাহিনী নিয়োগ করছিলেন। কিছু করা যায় নি। মধুকবি আশ্রয় নিয়েছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গে । কারণ বাঙালি উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে কি না স্বেচ্ছায় বেছে নিচ্ছে খ্রিস্টধর্ম! আগেই তাঁর গানে ফুটে উঠেছে হিন্দু ধর্মের অন্ধতা। এবার স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন। এমন ছেলেকে হাতছাড়া করবে না মিশনারিরা। তাই সেদিন গির্জার সামনে ছিল কড়া প্রহরা। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে বাবা রাজনারায়ণ দত্তের লেঠেল। তারাও বদ্ধপরিকর। ছেলেকে কিছুতেই তারা খ্রিস্টান হতে দেবে না। চরম নাটকীয় পরিস্থিতি। কিন্ত বাবার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মিশন রোয়ে ওল্ড মিশন চার্চে আর্চ ডিকন ডিয়াল্ট্রি মধুকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করে দেন। মাইকেল হলেন মধুসূদন দত্ত। আজকের কলকাতার লাল গির্জায় হয়েছিল এই চরম ‘নাটক’। কিন্তু কেন সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ছেলে এমনভাবে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হলেন? ইতিহাস বলছে, তৎকালীন হিন্দু সমাজ ও তার গোঁড়ামি। আরও সহজভাবে বললে, ইংল্যান্ডে যাবার প্রবল বাসনা, হিন্দু ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা, গ্রাম্য এক বালিকার সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক ভেঙ্গে দেওয়া, সর্বপরি রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিক্ষিতা কন্যা দেবকীর সঙ্গে প্রেম ও পাণি গ্রহণের ইচ্ছা তাকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হতে অনুপ্রানিত করেছিল বলে মনে করা হয়।

হিন্দুত্ব না থাকায় খ্রিস্টানের জন্য মধুসূদনের জন্য হিন্দু কলেজের দ্বার বন্ধ হয়ে যায়। ভর্তি হন শিবপুর বিশপস কলেজে। ১৮৪৮ সালে বাবা রাজনারায়ণ দত্ত পড়ার খরচ বন্ধ করে দেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দেবকীও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। লজ্জাবনত চিত্তে কলকাতা ছেড়ে সকলের অগোচরে মধুকবি পাড়ি জমান মাদ্রাজে। তারপর থেকে যা হয়েছে তা ইতিহাস। একসময় বিতৃষ্ণায় হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করা কবি ফের চর্চা শুরু করেন মহাভারত নিয়ে। মেঘনাদবধ কাব্য যে মধু কবির অসামান্য সৃষ্টি। অবশ্য সাহিত্যে তাঁর কোনও ক্ষোভ ছিল না। ক্ষোভ তো সমাজ সমাজব্যবস্থা নিয়ে।

বাংলার এই মহান কবির শেষজীবন অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্রে্যর মধ্যে কেটেছিল। ঋণের দায়, অর্থাভাব, অসুস্থতা, চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদি কারণে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। শেষজীবনে তিনি উত্তরপাড়ার জমিদারদের লাইব্রেরি ঘরে বসবাস করতেন। স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুর তিনদিন পরে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন বাংলার এই মহা কবি কপর্দকহীন অবস্থায় জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। আজ ২৫ জানুয়ারি,  মাইকেলের ১৯৬ তম জন্মদিন।