বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: এসএসকেএম হাসপাতালে পোষ্য কুকুরের ডায়ালিসিসকাণ্ডে এ বার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ ডাক্তার-নেতা সহ তিন ডাক্তারের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিল মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (এমসিআই)-র এথিক্স কমিটি৷ কেন্দ্রীয় মেডিক্যাল কাউন্সিলের গত চার নভেম্বরের এই নির্দেশে তিন মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়েছে৷

যদিও, এই নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্নও উঠছে৷ কারণ, ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলকে এই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এমসিআই৷ অথচ, মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ওই ডাক্তার-নেতা, বিধায়ক ডাক্তার নির্মল মাজি রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলেরই প্রেসিডেন্ট৷ তার উপর, তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থিত ডাক্তারদের সংগঠন প্রোগ্রেসিভ ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (পিডিএ)-এরও প্রেসিডেন্ট তিনি৷ স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহলে এমনও প্রশ্ন উঠছে, কেন্দ্রীয় নির্দেশ মেনে রাজ্য তদন্ত করলেও তার রিপোর্টে কতটা স্বচ্ছতা থাকবে?

এমসিআইয়ের এই নির্দেশ অনুযায়ী নির্মল মাজি বাদে অন্য যে দুই ডাক্তারের বিরুদ্ধে তদন্ত করবে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল, তাঁরা হলেন এসএসকেএম হাসপাতাল তথা ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমইআর), কলকাতার প্রাক্তন অধিকর্তা প্রদীপকুমার মিত্র এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান তথা আইপিজিএমইআর কলকাতার নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান রাজেন্দ্র পান্ডে৷ ২০১৫-য় এই নেফ্রোলজি বিভাগেই পোষ্য কুকুরের ডায়ালিসিসের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল৷ অভিযোগ, সরকারি ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবে মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ডাক্তার-নেতা নির্মল মাজির নির্দেশেই ওই পরিকল্পনা করা হয়েছিল৷

শেষ পর্যন্ত অবশ্য ওই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি৷ কারণ, বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে এসেছিল৷ তবে, ওই পরিকল্পনার বিষয়ে আইপিজিএমইআর, কলকাতার তৎকালীন অধিকর্তা প্রদীপকুমার মিত্রর মতভেদ প্রকাশ্যে আসার কারণে তিনি সরকারের বিরাগভাজন হন বলে অভিযোগ৷ এ দিকে, রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে৷ সব মিলিয়ে অধিকর্তার পদ থেকে তখন প্রদীপকুমার মিত্রকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলেও বিভিন্ন মহলের অভিযোগ৷ এই তদন্তের বিষয়ে নির্মল মাজির বক্তব্য জানার জন্য ফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়৷ তবে, একাধিকবার ফোন কল করা হলেও তিনি ধরেননি৷ যে কারণে, মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এই ডাক্তার-নেতার কোনও বক্তব্য মেলেনি৷

অন্যদিকে, এমসিআইয়ের এই তদন্তের বিষয়ে প্রদীপকুমার মিত্র বলেন, ‘‘এই বিষয়টি আমার জানা নেই৷’’ এই তদন্তের বিষয়ে রাজেন্দ্র পান্ডেও বলেন, ‘‘এই বিষয়টি আমার জানা নেই৷’’ এসএসকেএম হাসপাতালে পোষ্য কুকুরের এই ডায়ালিসিসকাণ্ডে নির্মল মাজি, প্রদীপকুমার মিত্র এবং রাজেন্দ্র পান্ডের মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন নম্বর বাতিলের জন্য আইন অনুযায়ী ২০১৫-র জুন মাসে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলে আর্জি জানিয়েছিল পিপল ফর বেটার ট্রিটমেন্ট (পিবিটি)৷ আইন অনুযায়ী এই ডায়ালিসিসকাণ্ডে তদন্তের আর্জিও রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে জানিয়েছিল পিবিটি৷ তবে, ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল নির্বিকার থাকায় এই দুই বিষয়ে তার পরে আইন অনুযায়ী এমসিআইতে আর্জি জানিয়েছিল পিবিটি৷

এমসিআইতে তাঁদের মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন নম্বর বাতিলের আর্জির বিষয়ে গত জুলাই মাসে প্রদীপকুমার মিত্রর কাছে জানতে চাওয়া হলে www.kolkata24x7.com-কে তিনি তখন বলেছিলেন, ‘‘এমসিআই যদি জানতে চায়, তা হলে বলব তখন কী হয়েছিল৷’’ ওই সময় নির্মল মাজির কোনও বক্তব্য মেলেনি৷ কারণ, তাঁকে ফোন কল করা হলেও তিনি কেটে দিয়েছিলেন৷ আর, রাজেন্দ্র পান্ডে কোনও মন্তব্য করতে চাননি৷ কিন্তু, এমসিআইয়ের নির্দেশ অনুযায়ী ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল আদৌ কি সেখানকার প্রেসিডেন্ট নির্মল মাজির বিরুদ্ধে তদন্ত করবে? কারণ, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলেই প্রথমে তদন্তের আর্জি জানিয়েছিল পিবিটি৷

এই বিষয়ে পিবিটির প্রেসিডেন্ট, ডাক্তার কুণাল সাহা বলেন, ‘‘আমাদের আশা, ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল এই তদন্ত করাবে যাঁদের দিয়ে, তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের বাইরের ডাক্তার অথবা ডাক্তার নন এমন কেউ৷’’ একই সঙ্গে পিবিটির প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল এই তদন্তের ক্ষেত্রে নির্বিকার থাকলে, কাউন্সিলের সদস্যরা ‘বিচারে বিঘ্ন’ ঘটানোর দায়ে জড়িয়ে যাবেন৷’’ শুধুমাত্র তাই নয়৷ ডাক্তার কুণাল সাহা বলেন, ‘‘এসএসকেএম হাসপাতালে পোষ্য কুকুরের ডায়ালিসিসকাণ্ডে বিচারের জন্য পিবিটির লড়াই জারি থাকবে৷’’ একই সঙ্গে তিনি ফের বলেন, ‘‘এসএসকেএম হাসপাতালে কুকুরের ডায়ালিসিসকাণ্ডে যেভাবে মেডিক্যাল এথিক্স লঙ্ঘন করা হয়েছিল, তার জন্য এই তিন ডাক্তারের বিরুদ্ধে এমসিআই কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আমরা আইনি সহায়তা নেব৷’’

- Advertisement -