কল্যাণ বসু

ট্রেনের কামরায় আমার পাশে মুখোমুখি বসে অনূর্ধ্ব তিরিশের দুই সহযাত্রী৷ পরে কথাবার্তায় বোঝা গেল তারা একই স্কুলের টিচার৷ এ কথা-সে কথার পর তাদের অনুপ্রবেশ এই সময়ে স্কুলশিক্ষা ক্ষেত্রের চাইতে সব চাইতে সংকটের বিষয়ে৷ ধরা যাক তাদের নাম নিলয় ও নীলিমা৷ ট্রেন ছাড়ল, বিষয়টি নিয়ে কথাবার্তা শুরু হল৷

নিলয়: চাইল্ড কেয়ার লিভ বা সিসিএল বলে মমতাদির সরকার মেয়ে কর্মীদের জন্য যেটা চালু করল, তোদের মানে, দিদিমণিদের জন্য তো একটা লোপ্পা মওকা! দিদি তো দিদিমণিদের জন্য ছপ্পড় ফাঁড়কে ছুটির ব্যবস্থা করে দিলেন!

নীলিমা: হুঁ৷ ভালোই তো৷ পুরুষ টিচারদের হিংসে হচ্ছে বুঝি?

নিলয়: এই দ্যাখ, কেমন যেন কথার মধ্যে নারীবাদী গন্ধ? আর হিংসের কথা যদি বলিস, তাহলে সেটা অস্বাভাবিক কী? একই পে স্কেলস, একই চাকরির শর্ত, অথচ তোরা ড্যাং ড্যাং করে সার্ভিস পিরিয়ডে ৭৩০ দিনের ছুটি ফোকটে এনজয় করবি!

নীলিমা: দ্যাখ, আবার আপত্তিকর ‘এনজয়’ শব্দটা ব্যবহার করলি৷ দিদিমণিরা কি এই ছুটিগুলো ফুর্তি করতে নেবে? ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার সময় কিংবা অসুস্থতার সময় এই ছুটি নেওয়ার প্রভিশন৷

নিলয়: এই বাকওয়াসের কোনও মানে হয় না৷ শুনেছিস নিশ্চয়ই, ছেলের অসুস্থতার কথা জানিয়ে আমাদের স্কুলের অঙ্কিতাদি প্রথম সিসিএল নেয়৷ আর অনিমেষদা পরিবার নিয়ে দিঘায় গিয়ে দেখেন, দিদিমণি সপরিবারে সমুদ্রে দাপাচ্ছে৷ভ্রমণক্ষেত্রে পরিচিত মুখ, সহকর্মী পেয়ে যেমনটা হয়, সে রকম উৎসাহ নিয়ে জলকেলি-করা অঙ্কিতাদিদের সঙ্গে কথা বলতে অনিমেষদা সম্মুখ-সমীপে৷ অনিমেষদা জানতেন না যে, অঙ্কিতা সিসিএলে আছে৷ অনিমেষদাকে দেখে ম্যাডামের নাকি নিমেষে মুখে নেমে এসেছিল নিরানন্দ, ভাটায় পরিণত জলোচ্ছ্বাস৷ ম্যাডাম নাকি বলেছে, ছেলেকে দিঘায় চেঞ্জে নিয়ে আসতে অ্যাডভাইস দিয়েছেন ডাক্তারবাবু৷আর তাই এই সমুদ্রক্রীড়া? ‘এনজয়’ শব্দটাকে আড়াল করতে ‘চেঞ্জে’’র আশ্রয় নেওয়াটার মোকাবিলা করা প্রশাসনের পক্ষে শুধু মুশকিলই নয়, না মুমকিন হ্যায়৷ কারণ অসুস্থতার জন্য ছুটি থাকলে সেই অসুস্থতার সঙ্গে চেঞ্জে যাওয়া ডাক্তারকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া, এবং চেঞ্জ মানেই ভ্রমণ….৷ তার মানে ভ্রমণের ছুটিকে সিসিএলে কনভার্ট করার মোক্ষম ‘প্রভিশন’, কী বলিস?

এবার আসি দিদিমণিদের সন্তানদের পরীক্ষা চলাকালীন ছুটির প্রসঙ্গে৷আচ্ছা, দিদিমণিদের ছেলেমেয়েরা তো আর ভিনগ্রহে পড়াশোনা করে না৷ তাদের পরীক্ষাও তো অন্যান্য স্কুলের সঙ্গে একই সময়ে৷ তাহলে সরকার যদি ওই সময় দিদিমণিদের ছুটির বন্দোবস্ত করে,তাহলে নিজের সন্তানের বাইরে স্কুলের যে শয়ে শয়ে ছাত্রছাত্রী আছে তাদেরও তো সেই সময় পরীক্ষা৷ তাদের কথা বাদ দিয়ে আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে? অথচ এই স্কুলে পড়িয়েই কিন্তু দিদিমণিদের মোটা মাইনে, প্রগাঢ় লিপস্টিক-চর্চিত, অলঙ্কার-প্লাবিত নিত্যনতুন পোশাকাকীর্ণ হয়ে স্কুলে আসা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে-গাড়িতে দিনযাপন, বিদেশ ভ্রমণ….৷ একটা অশ্লীল ইনজাসটিস৷

নীলিমা: তুই এমনভাবে রিপ্রেজেন্ট করছিস, যেন দিদিমণিরা ধান্দাবাজ৷

নিলয়: আমি তা বলছি না৷ সব দিদিমণিই কি এটাকে নৈতিকভাবে সমর্থন করেন? তোর কি মনে হয় একজন দিদিমণি হিসাবে?

নীলিমা: সেটা ঠিক, আমি দিদিমণি হয়েও স্বীকার করছি, এই ফরম্যাটে ৭৩০ দিন ছুটি বাড়াবাড়ি৷ এমনিতেই স্কুলে স্কুলে, ব্যাপক টিচারের ঘাটতি, তার সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-র মতো যদি দিদিমণিদের সিসিএলের হানা শুরু হয়, তাহলে তো স্কুল চালানোয় সমস্যা আসবেই৷

নিলয়: এক্সাক্টলি! আমি এই বৃহত্তর অভিমুখটিই খুলতে চাইছিলাম৷ ক্র্যামার ও তাঁর সহযোগীরা সারা দেশের ৩ হাজার স্কুলে চালানো সমীক্ষার ভিত্তিতে ২০০৫ সালে যে-তথ্য পেশ করেন তাতে দেখা গিয়েছে, যে-কোনও সাধারণ দিনে স্কুলগুলিতে অর্ধেকের কম শিক্ষক পড়ানোর কাজে যুক্ত আছেন৷ ‘প্রোবে’’’র (পাবলিক রিপোর্ট অন বেসিক এডুকেশন) ২০০৬ সালের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সারা দেশে শিক্ষকদের দৈনিক গরহাজিরার হার ২৫ শতাংশ৷ অমর্ত্য সেন মহাশয় ‘প্রোবে’র সমীক্ষার ফলকে কাজে লাগিয়ে হিসাব কষে দেখিয়েছেন স্কুলে টিচারদের ভয়ংকর গরহাজিরা এবং ক্লাসে না-পড়ানোর কারণে স্কুলে বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখার প্রায় ৭৫ শতাংশই জলে যায়৷ তার উপর দিদিমণিরা যদি সিসিএল নিয়ে ‘হকের পাওনা’ বলে ভেংচি কাটেন এবং ছুটিগুলি ‘এনজয়’ করেন, তাহলে কেমন স্বার্থপর মনে হয় না? জ্যাকুইন মিলারের কথাটা স্মরণ কর, দ্যাট ম্যান, হু লিভস ফর অ্যালোন,/ লিভস ফর দ্য মিনেস্ট মর্টাল নোন৷

নীলিমা: তা ঠিক৷ তবে এই সিসিএল নিয়ে তোরা দিদিমণিদের শুধু ফয়দা লোটার দিকটাই দেখছিস৷ কিন্তু এর আড়ালে তাদের ছোট হওয়ার রসদে লুকিয়ে আছে৷ গাড়িতে লেডিজ সিট, ট্রেনে লেডিজ কম্পার্টমেন্টস, মাতৃভূমি লোকাল…., এইসব যেভাবে নারী-পুরুষ সাম্যের আন্দোলনকে খর্ব করে, তেমনই এই সিসিএল৷ বরং শিক্ষিত মহিলাদের জন্য এই সুবিধা প্রদান নারীবাদী আন্দোলনকে খর্বায়িত করবে৷

নিলয়: ঠিক তাই৷ তবে সিসিএল-জনিত আরও কিছু নেতিবাচক দিকের কথা না বললেই নয়৷ যেমন, এক, সহকর্মী হিসাবে দিদিমণিদের প্রতি শিক্ষকদের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা, যা শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট কুপ্রভাব ফেলতে পারে৷ আবার, দুই, দিদিমণিদের নিজেদের মধ্যে কে আগে সিসিএলে যাবে, তা নিয়ে আন্তঃপ্রজাতি সংগ্রামও শুরু হয়ে গিয়েছে স্কুলে স্কুলে৷ আশা করছি, দিদিমণিরা লেডিজ কম্পার্টমেন্টের খিস্তিখেউড়, চুলোচুলি টিচার্সরুমে আমদানি না করেন৷ তিন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সিসিএলে যাওয়া নিয়ে দিদিমণিদের দূরত্ববৃদ্ধিরও বিপদ রয়েছে৷ ক্লাস নিতে নিতে হঠাৎ ২০-৩০ দিনের জন্য দিদিমণিদের সিসিএলে ডুব দেওয়াটা দূরত্ব বাড়াবেই৷ চার, চাইল্ড কেয়ার লিভ শুধু মা-টিচার পাবেন কেন? বাবা-টিচাররা কি সন্তানের কেয়ার নেন না? বরং পরীক্ষার সময় সন্তানকে রাত জেগে পড়ানো, পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়া, ডাব খাওয়ানো….ইত্যাদি তো মুখ্যত বাবারাই করেন৷ সন্তানের অসুস্থতার সময়েও দৌড়াদৌড়ি তো মূলত বাবাদেরই? তাহলে? সন্তান কি শুধু মায়েদের, যে সিসিএল তাঁদের ভাগ্যেই জুটবে শুধু?

নীলিমা: তুই যে সিসিএল নিয়ে এত ভেবেছিস সেটা ভেবে ভালো লাগছে৷ তোর বউ যদি দিদিমণি হয়, তাহলে কী করবি?

নিলয়: ভালো পয়েন্ট তুলেছিস৷ দেখছিস না, স্কুলে অধিকাংশ শিক্ষক যখন সিসিএলের বিরুদ্ধে বলছে তখন কয়েকজন শিক্ষক ভ্যাদা মেরে আছে, কারণ তাদের স্ত্রীরা অন্যান্য স্কুলে দিদিমণিগিরি করে৷ আর একটা মজাও দেখছি৷ যে অঙ্কিতা মমতাদেবীর বিরুদ্ধে উঠতে-বসতে বাপ-বাপান্ত করে সেই প্রথম সিসিএল নিয়ে প্রমোদে! এদের দেখেই জেন অস্টেন হয়তো বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ বিন আ সেলফিশ বিয়িং অল মাই লাইফ ইন প্র্যাকটিস, দো নট ইন প্রিন্সিপল৷’

নীলিমা: তুই একটা বিষয়ের এত কাটাছেঁড়া করিস না৷মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড়৷

নিলয়: আবার যে সন্তান ১৮ বছর বয়সী হতে চলল, মোবাইল দর্শনে পটুত্ব অর্জনের মাধ্যমে পক্কতাও যথেষ্ট অর্জিত, তার জন্যও চাইল্ড কেয়ার লিভ? তাছাড়া এইসব বেতন-সমৃদ্ধ দিদিমণি নিশ্চয়ই বেকার স্বামী বহন করেন না৷ তাহলে যুগ্ম উপার্জনে দুটি কেয়ার টেকার সন্তানের জন্য রেখে দিলেই তো পারেন৷ আশা করি, এমন বহু স্বামী-স্ত্রীর একদিনের বেতনেই তা মেটানো সম্ভব৷ তাহলে অত দিন সিসিএল নেওয়ার প্রয়োজনই থাকে না৷

নীলিমা: প্লিজ, একটু অন্য বিষয়ে চল৷

নিলয়: আর একটা কথা না শুনিয়ে ছাড়ছি না৷যে দিদিমণিদের সন্তানের বয়স ১৮ বছর অতিক্রম করে গিয়েছে, তাঁরা তো আর এই ছুটি পাবেন না৷ ফলে চোখের সামনে সহকর্মীদের অন্য কাউকে সিসিএল এনজয় করতে দেখলে স্বভাবসিদ্ধ ঈর্ষাপরায়ণ ওই রমণীরা হিংসায় জ্বলেপুড়ে সন্তান পুনরুৎপাদনে ব্রতী হলে আর এক বিপদ! যে দিদিমণিরা চাকরির স্বার্থে সন্তান নিতে দ্বিধাগ্রস্ত, তাঁরা মেটারনিটি লিভের দীর্ঘ সময়ের পরেও ৭৩০ দিনের সিসিএল পেলে সন্তানের সংখ্যা বাড়াতে উৎসাহিত হতেই পারেন৷ অর্থাৎ, সিসিএল জন্মসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে কি না বল?

নীলিমা: উফফ! তুই এবার থামবি?

নিলয়: আরে, সিসিএল বিষয়টি থামিয়ে দেওয়ার ব্যাপার নয়৷ প্রাথমিকে ইংলিশ তুলে দেওয়ার মতো এই সিসিএল-ও আর একটি বিষবৃক্ষ, যা রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে গত পয়লা আগস্ট পোঁতা হল৷ এর বিরুদ্ধে ক্রমাগত বলে যেতে হবে, যাতে দিদিমণিরা নীতিগতভাবে এই ছুটি নেওয়া থেকে বিরত থাকেন৷

ওদের এই কথার মধ্যেই আমার গন্তব্য স্টেশনে নামার জন্য উঠে পড়ি৷তরুণ প্রজন্মের শিক্ষক-শিক্ষিকারা যে নানাভাবে ভাবতে চাইছে, দেখেশুনে মনটা ভরে উঠল৷ ভিড় ঠেলে এগতেই কানে এল এক মাঝবয়সী ‘ভদ্রলোক’ রসিয়ে রসিয়ে বলছেন, ভোটের জন্য দিদি এবার দিদিমণিদের আরও ছুটি উপহার দিতে প্রতি মাসে পিরিয়ড লিভ না চালু করেন৷ওনার কথায় বেশ কয়েক জন সমস্বরে আরও নানা কুকথা শুরু করল৷ বুঝতে পারছি, একজন শিক্ষক হিসাবে যে সিসিএলকে কমিউনাল কেয়ার লিভ হিসাবে মনে করছি, পিরিয়ডগন্ধী ওই ‘ভদ্রলোকে’র মতো বহু লোকই তাকে ছিঃ ছিঃ এল বলেই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-ঘৃণা করবে৷

(লেখক পেশায় রসায়নের শিক্ষক)