প্রেম আর মোহের প্রতিদ্বন্দিতা চিরদিনের৷ একজন হৃদয়ে গোড়া গেঁড়ে বসতে চায়, অন্যজনের পছন্দ শুধু হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো৷ একজন দুটো মনকে আলিঙ্গন করায়, অন্য দুটো মনকে ভেঙে খান খান করে৷ তবু দ্বিতীয়জনের পিছনেই ছোটে মানুষ৷ জ্ঞানত নয়, অজ্ঞানেই৷ লিখলেন বিশাখা পাল৷

বয়স তখন চোদ্দ কি পনেরো৷ একজনকে মনে ধরেছিল৷ ভালো লেগেছিল৷ মনে হয়েছিল এর বাহুবন্ধনেই কাটিয়ে দেব সারাটা জীবন৷ রবীন্দ্রনাথ তখন ভালো লাগত না৷ হিন্দি ফিল্মের গান ভাসত মনে৷ সেই গানের বিভিন্ন সিনে চোখে ভাসত আমার আর তার কথা৷ বয়স যখন আর একটু বাড়ল, এই উনিশ কুড়ি, সময় তাকে সরিয়ে দিল৷ এনে দিল আর এক জনকে৷ তখন সবে সবে নষ্টনীড় পড়া হয়েছে৷ মন তখন সামনে অমিত বা লাবণ্যকে দেখছে৷ চাক্ষুষ করছে লাইভ “নীড়”৷ বয়স আর একটু বাড়ার পর সেই অমিত, লাবণ্য়রা হারিয়ে গেল৷ এল নতুন কেউ…

এমন ঘটনা হয়তো কমবেশি সবার সঙ্গেই ঘটেছে৷ কেউ একে বলেছে প্রেম, হারিয়ে যাওয়া প্রেম৷ নিজের কপালকে বারবার দুষেছে৷ বলেছে, ভালোবাসা তাকে ভালোবাসে না৷ তাই তো বেশিদিন টেকে না৷ আবার অনেকে, যারা ঘোর বাস্তববাদী, তারা বলেছে, ওগুলো জাস্ট ইনফ্য়াচুয়েশন৷ ক্ষণিকের মোহ৷

প্রেম আর মোহের প্রতিদ্বন্দিতা চিরদিনের৷ একজন হৃদয়ে গোড়া গেঁড়ে বসতে চায়, অন্যজনের পছন্দ শুধু হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো৷ একজন দুটো মনকে আলিঙ্গন করায়, অন্য দুটো মনকে ভেঙে খান খান করে৷ তবু দ্বিতীয়জনের পিছনেই ছোটে মানুষ৷ জ্ঞানত নয়, অজ্ঞানেই৷ কারণ, মোহের এক অদ্ভূত টান আছে৷ যেমন রোহিনীর ছিল৷ যেখানে হারিয়ে গিয়েছিল কৃষ্ণকান্ত৷

মোহের একটা বড় দোষ আছে৷ সে বড় বেশি তাড়াহুড়ো করে৷ আগুপিছু না ভেবেই কথা দিয়ে দেয়৷ মাঝখান থেকে দুটো জীবন হয়ে যায় নড়বড়ে৷ অবশ্য় “এক নজর মে ভি পেয়ার হোতা হয়৷” কিন্তু সেই সৌভাগ্য হয় কতজনের? ক্ষণিকের ভালোলাগা ভালোবাসায় রূপান্তরিত হওয়া মুখের কথা নাকি? একশো কোটি মানুষের মধ্য়ে হয়তো একজনের সেই সৌভাগ্য হয়৷ বাকিরা হয় মোহের শিকার৷ প্রেম কাছাকাছি আসতে চায়, উলটোদিকের মানুষকে জানতে চায়৷ কিন্তু ইনফ্যাচুয়েশন সেসবের ধার ধারে না৷ তার শুধু চাই আর চাই৷ তাকে আমার চাই মানে চাই৷ মনের কোনও এক প্রান্ত থেকে ক্রমাগত আওয়াজ আসতে থাকে, “ভালোবাসি ভালোবাসি৷” কিন্তু দেখা যায় দুদিনের মাথাতেই সেই ভালোবাসা গায়েব৷ যখনই দুই ব্য়ক্তির মধ্য়ে একটা দুটো করে অমিল বেরোতে শুরু করে, সেই ভালোবাসা দেখা যায় জানলা গলে কোথায় যেন পালিয়ে গেল৷ যদি পালিয়ে যেত, তাও ঠিক ছিল৷ এ তো আবার সঙ্গে অনেকখানি অনুভূতি নিয়ে পালিয়ে যায়৷

কেউ কেউ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, সময় এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ভুলে যেতে পারে৷ কারোর প্রলেপ পড়ে না কোনওদিনই৷ সময়ের সাথে বুড়িয়ে যায় মন৷ কিন্তু সেই একটা ঘটনার সাক্ষ্য় বহন করে গোটা জীবন৷ সেই নির্দিষ্ট মানুষটাকে সে হয়তো আর ভালোবাসে না৷ কিন্তু অন্তরে সদাই একটা ভয় রয়ে যায়৷ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ভয়৷ তবে প্রেমের ক্ষেত্রে বিষয়টা কিঞ্চিত্ আলাদা৷ একবার ধাক্কা খেলে তাকে জীবনভোর ভোলা যায় না৷ বারবার মনে হয়, “আমাদের গেছে যে দিন, তা কি একেবারেই গেছে? কিছুই কি নেই বাকি?” হায় পোড়া মন৷ বোঝে না, ওটা প্রেম৷

একটু আগেই কথা হচ্ছিল ইনফয়াচুয়েশনের তাড়াহুড়ো নিয়ে৷ হক কথা৷ ইনফ্য়াচুয়েশন কোনও কিছুকেই সময় দেয় না৷ যেখানে প্রেম বলে “রোসো বাবা৷ দেখো, বোঝো, জানো ব্য়াপারটা কী৷” সেখানে ইনফ্য়াচুয়েশন বলে, “কাল করে যো আজ করে, আজ করে সো অভি৷” শারীরিক সম্পর্ক সেখানে সবার আগে চলে আসে৷ মনে হয়, “এটা তো দরকারী৷ আমি ওকে ভালোবাসি৷ তবে এখনই কেন ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারব না?” সেখানে সময় ব্রাত্য৷ চোখের পলক ফেলতেই বিয়ে, পরিবারের স্বপ্ন দেখে ফেলে৷ ভেবে ফেলে বিয়ের পর সবার থেকে আলাদা কোনও নির্জন দ্বীপে গিয়ে থাকব৷ জীবনের খেলাঘর বাঁধব, সেখানে কারোর নো এন্ট্রি৷ কিন্তু আদতে কি তেমন হয়৷ একেবারেই না৷ প্রেম কিন্তু এতশত বোঝে না৷ অনুভূতি সেখানে থাকে ষোলো আনা৷ কিন্তু সেই সঙ্গে বাস্তবতাও মিশে থাকে পরতে পরতে৷ ভবিষ্য়ত পরিকল্পনা সেখানেও হয়৷ কিন্তু রয়ে সয়ে৷ “আগে জীবনে সেটেলড হব, তারপর বিয়ে৷ হ্য়াঁ আমি ওকে ভালোবাসি৷ কিন্তু আমি যদি ওকে খুশি রাখতে না পারি, তাহলে নিজের কাছে মুখ দেখাব কী করে৷ তার চেয়ে আগে তৈরি হই, তারপর৷”

প্রেম আর ইনফ্য়াচুয়েশনের মধ্য়ে তফাত্ করতে পারা কিনতু বেশ জটিল৷ কিন্তু পথ যে একেবারেই নেই তাও নয়৷ হালকা ফুলকা কয়েকটি ইঙ্গিত থাকে৷ যেমন প্রেমিক বা প্রেমিকাকে ইমপ্রেস করার জন্য় ফুল ফোর্সে প্রশংসাবাক্য় ছাড়লেই সমস্য়া৷ ইনফ্য়াচুয়েশন হওয়ার হাই চান্স৷ অবস্থাটা কিন্তু তখন সেই খরগোশটার মতো৷ যে মুখ লুকিয়ে ভাবত সে কিছু দেখতে পাচ্ছে না৷ একই ব্যাপার ঘটে এখানেও৷ সঙ্গীর ভুলগুলোর উপর চোখ বন্ধ হয়ে যায় তখন৷ এটা কিন্তু সিরিয়াস ইস্যু৷ এমন হলে ভুলেও ভাবা উচিত নয় প্রেম হয়েছে৷ এমন পরিস্থিতিতে বাস্তবতা বহু দূরে পালিয়ে যায়৷ ওকে পালাতে দিলেই মুশকিল৷ মোহকে প্রেম ভেবে ফাঁদে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা৷ ইনফ্যাচুয়েশন কিন্তু ক্ষিপ্ত সমুদ্রের মতো আছড়ে পড়বে ক্য়ারিয়ার, পরিবার, বন্ধুমহলে৷ কখনও কখনও এই কালনাগিনী সবার থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়৷ এমন হলে সাধু সাবধান৷ কারণ প্রেম মানুষকে সবার সঙ্গে চলতে শেখায়৷ আলাদা করতে শেখায় না৷

অনেকে বলে, প্রেমের একটা বদ অভ্যাস আছে৷ ভয়৷ ভালোবাসলেই ভয় দানা বাঁধে মনে৷ তাতে হাজার সমস্যা৷ মিথ্যে নয়৷ হয়তো একেই বলে অন্তরের টান৷ সেই ভয়টা তো পরিবারের মানুষগুলোর ক্ষেত্রেও কাজ করে৷ তাহলে পার্টনারের আর কি দোষ৷ এই টান না থাকলে অনুভূতি আসবে কোথা থেকে? তাই ভয়৷ থাকবেই৷ কিন্তু হিংসা? নৈব নৈব চ৷ প্রেম কিন্তু ওর ঘোর বিরোধী৷ ওর উপর একচ্ছত্র আধিপত্য ইনফ্যাচুয়েশনের৷ ভালোবাসার মানুষটি যদি রূপবান, গুণবান বা রূপবতী, গুণবতী কারোর সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করে, মনের মধ্যে হিংসা নামক জীবটি ক্রমশ বড় হতে থাকে৷ বলে, “দেখো, ওর সঙ্গে কেমন ঢলে ঢলে কথা বলছে৷ আমার বেলাতেই লবডঙ্কা৷” শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্য়ি৷ এটা কিন্তু প্রেম একেবারেই মেনে নেয় না৷ তার বক্তব্য়, “ও আমারই৷ কারণ আমি ওকে ভালোবাসি৷ ও বাসল কিনা, তাতে ছাই বয়েই গেল৷”

প্রেম কিন্তু এমন অনুভূতি যার জন্য় “কলঙ্কভাগী” হওয়া য়ায়৷ কিন্তু ইনফ্যাচুয়েশন, “মায়াবনবিহারিণী হরিণী”-র মতো৷ ধরতে গেলেই পিছলে যায়৷ তাহলে, “কেন তারে ধরিবারে করি পণ, অকারণ?” তার চেয়ে “নিভৃত যতনে” নিজের সুখ নীড় বাঁধলে কিন্তু তা টেকসই হয় অনেক বেশি৷ একথা ঠিক, মোহ থেকে বেরোনো সহজ কথা নয়৷ রাক্ষসীর মতো সে চারদিক থেকে মানুষকে আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়ে রাখে৷ কিন্তু মনের সেই জোরটুকু আছে, যে সে সেই বাঁধন আলগা করতে পারবে, তার জন্য় দরকার শুধু একজন মানুষের৷ যে হাত বাড়িয়ে বলবে, “আছি তো…”

- Advertisement -