বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: নন্দীগ্রামের আন্দোলনের প্রভাবেই ২০১১-য় সরকার গড়তে পেরেছে তৃণমূল কংগ্রেস৷ এমনই মনে করে ওয়াকিবহাল মহলের বিভিন্ন অংশ৷ অথচ, এই আন্দোলনের সূতিকাগারেই প্রসূতি এবং নবজাতকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিই এখন উপেক্ষিত হয়ে চলেছে৷ আর, তারই জেরে, স্বয়ং ‘মা-মাটি-মানুষে’র সরকারের আমলেই প্রাণসংশয়ে রয়েছেন এখন আন্দোলনের সূতিকাগার নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লকের বহু মা এবং শিশু৷

কেন প্রসূতি এবং নবজাতকদের প্রাণসংশয়? কারণ, পশ্চিমবঙ্গের অন্য বিভিন্ন স্থানের তুলনায় নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লকে হাসপাতালে অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার এখনও অনেক কম৷ কেন কম? কারণ, নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লকে চলছে কোয়াক ডাক্তার এবং দাই (ধাই)-দের দৌরাত্ম্য৷ এই দৌরাত্ম্যে আবার শাসকদলের স্থানীয় বিভিন্ন নেতার প্রশ্রয় রয়েছে৷ যার জেরে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধিতে সফল হতে পারছে না স্বাস্থ্য দফতর৷ অথচ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার না বাড়লে, প্রসূতি এবং নবজাতকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টি যেমন উপেক্ষিত থেকে যায়৷ তেমনই, তার জেরে আবার, প্রসূতি এবং শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার বিষয়টিও বাধাপ্রাপ্ত হয়৷

রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লকে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৬৫ শতাংশের মতো৷ অথচ, পাশের দুই নম্বর ব্লকেই এই হার ৮৫-৯০ শতাংশ৷’’ কেন এতটা পার্থক্য? তিনি বলেন, ‘‘এমনিতেই নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লক সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা৷ তার উপর এখানে রয়েছে কোয়াক ডাক্তার এবং দাইদের দৌরাত্ম্য৷ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্রয়ে থাকা এই কোয়াক ডাক্তার আর দাইদের জোট ভাঙতে পারছে না স্বাস্থ্য দফতর৷’’ একই সঙ্গে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এই আধিকারিক বলেন, ‘‘প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বাড়লে যেমন প্রসূতি এবং নবজাতকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি আরও নিশ্চিত করা যাবে৷ তেমনই, প্রসূতি এবং শিশুমৃত্যুর হারও আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে৷ অথচ, এই বিষয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও কোনও হেলদোল নেই৷ বড় মাপের কোনও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন কি না, সেই বিষয়টি নিয়েই স্থানীয় নেতারা বেশি মাতামাতি করছেন৷’’

নন্দীগ্রাম দুই নম্বর ব্লকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বেশি হওয়ার জন্য যে সব কারণ রয়েছে, তার মধ্যে সেখানকার মহিলাদের শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন স্বাস্থ্য দফতরের এই আধিকারিক৷ কোয়াক ডাক্তার এবং দাইদের দৌরাত্ম্য ভাঙতে না পারলেও, নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লকে অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য দফতরের তরফে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালু রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি৷ চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে রাজ্যে সাতটি স্বাস্থ্যজেলা তৈরি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের আমলে৷ এই সাতটি স্বাস্থ্যজেলার মধ্যে নন্দীগ্রাম একটি৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ ওই একই লক্ষ্যে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালকে উন্নীত করা হয়েছে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে৷ যদিও, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সহ পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতির কারণে এই সব সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের পরিষেবা এখনও পর্যন্ত পুরোদমে চালু হয়নি৷

কিন্তু, নন্দীগ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়নে স্বাস্থ্য দফতরের তরফে কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে? রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘নন্দীগ্রামের জন্য পৃথক কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি৷ গোটা রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মান উন্নয়নের জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, এখানেও সেই রকম৷ তবে, নন্দীগ্রাম গ্রামীণ হাসপাতালকে একধাপে জেলা হাসপাতালে উন্নীত করা হয়েছে৷ রাজ্যের অন্য কোথাও এমন হয়নি৷ এখানেই গড়া হয়েছে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল৷’’ নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লকে অবস্থিত এই হাসপাতালের কী অবস্থা এখন? রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, ৩০০ শয্যার এই হাসপাতালে এখনও পর্যন্ত চালু হয়েছে মাত্র ৩০টি শয্যা৷ এখানে এখনও পর্যন্ত স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি, শিশু এবং প্যাথোলজি বিভাগ চালু হয়েছে ঠিকই৷ তবে, অ্যানেস্থেসিস্টের অভাবে নন্দীগ্রামের সুপার স্পেশালিটি এই হাসপাতালে এখনও চালু হয়নি সিজারিয়ান সেকশন৷ আর, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) চালুর জন্য চলছে পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ৷