দেবযানী সরকার ও সুমন বটব্যাল, কলকাতা: উলোটপুরাণ! প্রার্থী না হয়েও ভোটের ময়দানে তিনি ভীষণভাবে উপস্থিত!

তিনি মঞ্জু বসু, তৃণমূলের নোয়াপাড়ার দু’বারের প্রাক্তন বিধায়ক৷ প্রার্থী হতে না পেরে প্রথমে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, পরে নাটকীয়ভাবে ভোলবদলে আস্থা রেখেছেন দিদিমণিতেই৷ কিন্তু দলীয় প্রার্থীর প্রচারের ময়দানে এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি তাঁকে৷

২৫ জানুয়ারী নোয়াপাড়ায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী জনসভা রয়েছে৷যুবরাজের ওই হেভিওয়েট সভায় কি তাঁকে দেখা যাবে? ভোটের ময়দানে শাসক-বিরোধী তরজার মাঝে লাখ টাকার এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে এলাকার বাসিন্দাদের মুখে মুখে৷কেউ কেউ টিপ্পনি কাটছেন, ‘‘তবে কি মুকুল রায়ের অভিযোগটাই সঠিক!’’

পড়ুন: ‘খুনিদের দলে ফিরতে পারব না’, মুকুলকে বলেছিলেন মঞ্জু

পাটি গণিতের হিসেবে, নোয়াপাড়ার উপ-নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হওয়ার দাবিদারে এক নম্বরে ছিলেন দু’বারের বিধায়ক মঞ্জু বসু৷সূত্রের খবর, মঞ্জুদেবীকে প্রার্থী করতে চেয়েছিলেন স্বয়ং দলের ‘যুবরাজ’ও৷যদিও রাজনীতির কানাগলিতে যাবতীয় হিসেব উল্টে ভগ্নিপতি সুনীল সিংকে প্রার্থী করিয়ে বাজিমাত করেছেন ভাটপাড়ার দোর্দন্ড প্রতাপ তৃণমূল বিধায়ক অর্জুন সিং৷ সেসময় সংবাদ মাধ্যমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছিল মঞ্জুদেবীকে৷স্বভাবতই তৃণমূলের ঘোলাজল থেকে ফায়দা তুলতে আসরে নেমেছিলেন বিজেপি নেতা মুকুল৷

মুকুলের কৌশলে আস্থা রেখে ৭ জানুয়ারী, রবির দুপুরে দিল্লির সদর দফতর থেকে নোয়াপাড়া আসনে মঞ্জুদেবীর নাম ঘোষণা করেছিলেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব৷ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নজিরবিহীনভাবে পাল্টা সাংবাদিক বৈঠক করে বিজেপি নেতৃত্বকে কার্যত ‘পথে বসিয়ে’ মঞ্জুদেবী বলেছিলেন, ‘‘আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আস্থাশীল৷ তৃণমূল ত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না!’’

পড়ুন: মুকুলহীন তৃণমূলে দিদিমণির বকলমে প্রধান মুখ ‘অভিষেক’ই

তাঁর সেই মন্তব্যকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে, হচ্ছেও৷শাসকদলের প্রথমসারির নেতারা সরাসরি মুকুল রায়কে তোপ দেগেছেন৷পাল্টা হিসেবে মুকুল রায় প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন, ‘‘আমি তো মঞ্জু বসুকে কোলে করে বিজেপিতে নিয়ে আসিনি৷ উনি নিজে থেকে এসে বলেছিলেন- স্বামীকে যারা খুন করেছে, সেই তৃণমূলে আর থাকতে চাই না৷’’ অভিযোগ করেছেন, ‘‘রাজ্যে গণতন্ত্র নেই৷মঞ্জু বসুর ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, যে উনি সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন৷’’

তাৎপর্যপূর্ণভাবে ৭ জানুয়ারীর সেই সাংবাদিক বৈঠকের পর আর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে দেখা যায়নি মঞ্জুদেবীকে৷ মোবাইলে বারংবার ফোন করা হলেও কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি৷এমনকি দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে উপনির্বাচনের প্রচারেও তাঁকে দেখতে পাননি কর্মীরা৷স্বভাবতই তাঁকে ঘিরে সরগরম নোয়াপাড়ার রাজনীতি৷

তৃণমূলের একাংশ কর্মী বলছেন, চাপের কাছে কার্যত নতি স্বীকার করলেও উপনির্বাচনে গুরুত্ব না পেয়ে যথেষ্ট অপমানিত হয়েছেন মঞ্জুদেবী৷দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, নোয়াপাড়ার দলীয় প্রার্থী সুনীল সিং মঞ্জুদেবীর বাড়ি বয়ে দেখা করে এলেও অর্জুন সিং নিজে চাইছেন না মঞ্জুদেবী ভোটের প্রচারে নামুক৷দলের আরেকটি অংশের অভিমত, প্রচারে না গিয়ে ‘নীরব’ প্রতিবাদের পথকেই বেছে নিয়েছেন মঞ্জুদেবী৷দলীয় প্রার্থীর প্রচারে না বেড়িয়ে তিনি কৌশলে নোয়াপাড়াকে বার্তা দিতে চাইছেন যে মুকুল রায়ের অভিযোগই সঠিক, -‘চাপের মুখেই সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন৷’

পড়ুন: মুকুলহীন দলে ছাত্র-যুবাদের রাজনীতির পাঠ নেবেন দলনেত্রী

জল্পনা উড়িয়ে মঞ্জু ঘনিষ্ট এক অনুগামীর আক্ষেপ, ‘দিদি দু-দু’বারের বিধায়ক৷ওঁনার তো আত্মসম্মান বোধ রয়েছে৷দলনেত্রীর কথায় উনি দলে থেকে গিয়েছেন, কিন্তু না ডাকলে দিদি কেন প্রচারে যাবেন? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও চান দিদিকে প্রচারে ডাকা হোক৷ তারপরও দিদিকে সম্মান দেওয়া হচ্ছে না৷’ যদিও প্রচারে মঞ্জুদেবীর অনুপস্থিতির বিষয়ে ভাটপাড়ার বিধায়ক অর্জুন সিংয়ের কৌশলী মন্তব্য, ‘আমি প্রচার কমিটিতে নেই৷ পুরো বিষয়টি তদারকির দায়িত্বে আছেন বালু’দা(জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক)৷ আমি এব্যাপারে কিছুই জানি না৷’’ বারংবার ফোন করা হলেও জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের অবশ্য কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি৷

শীর্ষ নেতৃত্বর একাংশও মানছেন, প্রচারে মঞ্জুদেবীর অনুপস্থিতি নোয়াপাড়ার দলের কোন্দলকেই প্রকট করছে৷তাই নিন্দুকদের মুখে ছাই দিতে দলের হুইপ মেনে ২৫ জানুয়ারী অভিষেকের সভায় দেখা যেতে পারে তাঁকে৷ তবে বক্তব্য রাখবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আসবেন তো? নাকি ‘অসুস্থতা’র কারণ দেখিয়ে যুবরাজের সভাকেও এড়িয়ে যাবেন অভিমানী মঞ্জু? কর্মীদের পাশাপাশি এই প্রশ্নটা ভাবাচ্ছে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বকেও৷

অগত্যা, প্রার্থী না হয়েও নোয়াপাড়ার ভোট রাজনীতিতে ভীষণভাবে উপস্থিত মঞ্জু বসু৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ