শান্তিনিকেতনে গড়ে উঠেছে তাঁর মনন। আমাদের অনেকের মতোই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তিনিও খুঁজে পান রবীন্দ্রনাথকে। ভালোবাসেন রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি সংগ্রহ করতে। মনীষা মুরলী নায়ার— যাঁর কণ্ঠ অদ্ভুত এক প্রশান্তি বইয়ে আনে রসজ্ঞ শ্রোতার মনে, তাঁর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সৌম্য দে

প্রশ্ন: যাঁরা তথাকথিত নন, তাঁরা কেমন ভাবে অর্থ বুঝে বাংলা গান পরিবেশন করেন, সাধারণ মানুষের মনে খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্ন জাগে। কিন্তু, তোমার ক্ষেত্রে এটাও তো সত্যি যে তুমি যেহেতু খুব ছোটবেলায় শান্তিনিকেতনে এসেছ, তোমার কাছে বাংলা ভাষা একেবারেই ততটা অস্বাভাবিক নয়।

উত্তর: একদম। আমার কাছে বাংলা ভাষাই আমার শেখা প্রথম ভাষা। প্রায় এক দেড় বছর বয়সে আমি শান্তিনিকেতনে এসেছিলাম। ফলে, আমার কাছে বাংলা শেখাটা খুব বড় কিছু বলে মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে বাংলা অনেক সহজ ভাষা। কারণ, আমার বাবা মা একটু বড় বয়সে এসেও সহজে শিখে ফেলেছেন। একটু হয়তো সাউথ ইন্ডিয়ান টান রয়েছে, কিন্তু তা হলেও তাঁরা তো সুন্দর ভাবে এত বছর নিজের কাজকর্ম করেছেন, এখনও রয়েছেন। এখন তো ছেড়ে কোথাও যাবেন না ঠিক করেছেন, এটাই ‘আমাদের’ জায়গা হয়ে গিয়েছে। এটা খুব বড় ব্যাপার—একটা অন্য প্রদেশ থেকে এসে এতা নিজের হয়ে যাওয়া, তাতে নিজেদের কৃতিত্ব আছে। আমার পরিবেশের কৃতিত্বও আছে।

তবে হ্যাঁ, মাতৃভাষা মালায়ালামও জানি। আমার মা সেদিক থেকে একটু বেশি সজাগ ছিলেন। যাতে দেশে কখনও গেলে, দাদু-দিদার সঙ্গে কথা বলতে না পারার দুঃখটা না থাকে। আমাদের বাড়িতে একটা ছোট কেরালাও মা তৈরি করেছেন যাতে আমরা ওখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের যোগাযোগ রাখতে পারি।

প্রশ্ন:  রবীন্দ্রনাথের গানে ‘মনোজ-মনীষা’ brother-sister duol  এরকম তো সচরাচর দেখা যায় না…

উত্তর:  এটা না ঠিক ভেবে-চিন্তে করা নয়। আমার আরেক দাদা আছে—মনীষ। ছোটবেলায় আমারা তিনজন একসঙ্গে গান শিখেছি, যেরকম আর পাঁচটা পরিবারে হয়। তারপর যখন কলকাতা শহরে আসি, এটা কিছুটা বিশ্বদার-ও (‘ভাবনা’-র বিশ্ব রায়) ভাবনা ছিল। আর সত্যি কথা বলতে, আমি দাদাকে ছাড়া কোনওদিন গান গাইনি। আসলে কি জানো তো এই গান-বাজনা ব্যাপারটায় ভীষণ স্বস্তির প্রয়োজন হয়। দাদার সঙ্গে গাইতে গেলে আমি সেই মানসিক স্বস্তি অনুভব করি। আমার তাই দাদার ছত্রছায়ায় গাইতে ভালো লাগে।

প্রশ্ন: অনেক দিন আগে মধুসূদন মঞ্চে তোমাদের একক শুনতে গিয়েছিলেম। আমার মনে আছে, অনুষ্ঠান শেষে এক শ্রোতা মন্তব্য করেছিলেন ‘মনীষা মুরলী নায়ার কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো গান করেন’।

উত্তর: এটা আমার কাছে বড় সৌভাগ্যের জায়গা। কিন্তু অস্বীকার এ জন্যই করব কারণ অতবড় আকাশ ছোঁয়ার ধৃষ্টতা আমার নেই। শান্তিনিকেতনের একটা সঙ্গীত ধারা আছে, মোহরদির প্রভাব তাঁর মধ্যে সব থেকে বেশি। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গান শেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমি যাঁর কাছে গান শিখেছি (বুলবুল বসু) তিনি শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং কণিকা বন্দ্যোধ্যায়ের ছাত্রী। ফলে ওই সঙ্গীতধারা বা গায়কি বুলবুলদির মধ্যে খুব বেশি রকম রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গান শিখতাম ছোট থেকেই। কিন্তু দেখবে, একজন কোনও মানুষের গান শুনে তাঁর প্রতি, এবং সেই গানের প্রতি একটা ভালোবাসা জন্মায়। সেই রকম মোহরদির গান শুনে আমার রবীন্দ্রনাথের গান খুব ভালো লাগতে শুরু করল। পরবর্তীতে আমি যখন বুলবুলদির কাছে গান শিখতে গেলাম, আমিও সেই ছোঁয়াটা পেয়েছি। ওই throwing, ওই উচ্চারণের ভঙ্গি, রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি আমায় আরও টানে। সেই জন্য হয়তো সেই প্রভাবটা আমার মধ্যে রয়েছে।

প্রশ্ন: তুমি যে সময়টায় শান্তিনিকেতনে বড় হয়েছ আর এখন যখন যাও নিশ্চয়ই কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য কর…

উত্তর: পরিবর্তন সব জায়গায় হচ্ছে। শান্তিনিকেতনের পঠন-পাঠন পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে। আজকাল, শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী যাঁরা, তাঁদেরকে এরকম জিজ্ঞেস করলে, তাঁরা বলেন ‘আমাদের সময় ভীষণ ভালো ছিল এখন তোদের বেলায় কী খারাপ হয়েছে, এটা নয়। আমি এটা বলব না। অনেক কিছু ভালোও হয়েছে। অনেক নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। শান্তিনিকেতনে বসে মানুষ কাজ করবে, তাতে উপকার পাবে সারা বিশ্ব—এরকম চিন্তাধারা রবীন্দ্রনাথের ছিল বলেই তিনি শান্তিনিকেতন তৈরি করেছিলেন। ফলে, আমি এটা মনে করি না যে ওখানে বাইরের হাওয়া লাগবে না। হ্যাঁ, গাছের তলায় ক্লাস করার একটা করণ ছিল—প্রকৃতির সঙ্গে মেশার একটা খুব বড় দিক। সেগুলো নষ্ট না হোক আমিও চাই। তাই বলে, বৃষ্টি পড়লে ঘরবাড়ি থাকবে না, ছেলেমেয়েরা বর্ষাকালে পড়াশোনা করবে না—এটাও ঠিক নয়। কারণ কম্পিটিশনটা বাইরে কিন্তু খুব বাড়ছে। মানে, আমি শান্তিনিকেতন বললে মানুষ এটা ভাববে না যে আমি ১২ মাসের জায়গায় ৯ মাস ক্লাস করেছি। আমাকে কিন্তু ১২ মাস যারা ক্লাস করেছে তাদের সঙ্গেই কম্পিটিশনটা দিতে হবে। ফলে সব খারাপ হয়েছে আমি বলছি না।

কিছু কিছু ব্যাপার, যেমন ধর, শান্তিনিকেতন এখন একটা ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে পরিচিত হচ্ছে, আমি তাতে বিরক্ত। শান্তিনিকেতন কিন্তু ট্যুরিস্ট স্পট নয়। অনেকেরই শান্তিনিকেতনে বাড়ি আছে। তারা উইকএন্ডে সেখানে যান। আমোস-প্রমোদ করে ফিরে আসেন। এটা আমার ভালো লাগে না। তুমি মানসিক শান্তির জন্য যাও— সেটা ঠিক আছে।

আর আমাদের মাস্টারমাশাইয়েরা ভীষণ ধরাছোঁয়ার মধ্যে ছিলেন। ফোন করে আগে থেকে অ্যাপোয়েনমেন্ট নেবার ব্যাপার ছিল না। হুট করে চলে যেতাম। আমার বাবা যেহেতু ওখনকার শিক্ষক ছিলেন, আমি অনেক দেখেছি এরকম—দুপুরবেলা কোনও ছাত্র/ছাত্রী চলে এলেন, হয়তো আমরা তখন খেতে বসেছি, আমাদের মধ্যে তাকেও টেনে নিলাম।

সেই স্পন্দনটা বোধ হয় এখনও রয়েছে শান্তিনিকেতনে—রবীন্দ্রনাথও এখনও আছেন। যদি উত্তরায়ণ বা আম্রকুঞ্জ কিংবা ছাতিমতলায় কিছুক্ষণ বসে থাকলে সেটা অনুভব করা যায়। এটা খুব জোর গলায় বলছি—অনুভব করার মতো কেউ একজন আছেন। আমি বিশ্বাস করি রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে গেলে শান্তিনিকেতন ধ্বংস হয়ে যাবে।

প্রশ্ন:  তোমাদের একটি অ্যালবামের কথা মনে পড়ছে। বালসারাজির সঙ্গে ‘ফাগুন হাওয়ায়’। মানে one in a lifetime অভিজ্ঞতা

উত্তর: সেটা সত্যি খুব বড় পাওয়া আমাদের জীবনে। বিশ্বদাকে এরজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। এটাই বালসারজির শেষ কাজ। আমরা স্টুডিয়োতে লাইভ রেকর্ড করেছিলাম। তিনি ভীষণ অসুস্থ তখন। ওনাকে ধরে ধরে বসানো হল। কিন্তু উনি পিয়ানোয় একবার হাত দিলে কোনও অসুখ তাকে গ্রাস করতে পারবে না। সঙ্গীত সত্যি ঈশ্বরের দান। ওনার কথাগুলো এখনও কানে বাজে—“আমি এটা বাজাবো, তারপরে গান ধরবি”। পুরানো সেই দিনের কথা গানটা আমি আর দাদা আমাদের বুদ্ধিমতো ভাগাভাগি করেছি—সেটা দেখে উনি খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন “তোমাদের ডুয়েলগুলো এভাবেই তোমরা করবে। কথা বুঝে, গলার রেঞ্জ গাইবে”। আমরাও তেমনই গেয়েছিলাম।

- Advertisement -