ঢাকা: মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘দানবীর’ রণদা প্রসাদ সাহা ও তাঁর পুত্র সহ সাতজনকে অপহরণ করে খুনের মামলায় তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাদের মদতকারী ও রাজাকার মাহবুবুর রহমানের ফাঁসির সাজা হল। রায় জানতে উদগ্রীব ছিল বাংলাদেশ। বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বৃহস্পতিবার আসামির উপস্থিতিতে এই রায় দেন।

১৯৭১ সালের ৭ মে মধ্যরাতে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজাকারদের মদত নিয়ে পাকিস্তানি সেনার ২০-২৫ জন রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ি ঘিরে নেয়৷ তিনি বন্দি হন৷ প্রবল অত্যাচার করা হয়৷ এর আগেও তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷ প্রথমবার ছাড়া পেয়েছিলেন৷ কিন্তু দ্বিতীয়বার আর ফিরে আসার সংবাদ পাওয়া যায়নি৷

মুক্তিযুদ্ধ চলছে৷ রক্তাক্ত পূর্ব পাকিস্তান৷ বাঙালি জাতি তার নিজস্বতা নিয়েই বিরাট পাক সেনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে৷ সেই সময়েই রাজাকার বাহিনি গুম করেছিল শিল্পোদ্যোগী বাঙালি তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রণদা প্রসাদ সাহাকে৷ ৪৮ বছর হয়ে গিয়েছে সেই ঘটনার৷ তাঁর দেহ মেলেনি৷

বাংলাদেশ সরকার কৃতি উদ্যোগী ও ব্যবসায়ী রণদা প্রসাদ সাহাকে ১৯৭৮ সালে মানবসেবায় অসামান্য অবদান রাখায় স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করে৷ দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা নামেই তাঁর পরিচিতি পদ্মা-মেঘনা-শীতলক্ষ্যা নদীর দেশে৷ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই শীতলক্ষ্যা নদীর জলেই ভাসিয়ে দেওয়া হয় বহু মানুষের দেহ৷ তাদেরর মধ্যেই ছিলেন গরিবের দুঃখ দুর্দশায় বন্ধু রণদা প্রসাদ সাহা৷ পরিবারের আরও কয়েকজন কোনওরকমে বেঁচে গিয়েছিলেন৷ আর রয়ে গিয়েছে কৃতি ব্যক্তির তৈরি একের এক প্রতিষ্ঠান৷ স্বাধীনতার পরেও বহু জনের আশা ভরসার কেন্দ্র৷

জন্ম ১৮৯৬ সালের ১৫ নভেম্বর৷ পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ সাহা পোদ্দার এবং মাতার নাম কুমুদিনী দেবী। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান রণদা প্রসাদ পরবর্তী কালে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হন৷ একাধিক ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন৷ ব্রিটিশ আমলে কখনও পাঠ, কয়লা তো বিমা ব্যবসায় তিনি হয়েছিলেন কোটিপতি৷ সঙ্গে ছিল সমাজকে গড়ার স্বপ্ন৷ সেই কারণে শুরু করেন দানধ্যান৷ এতেই রণদা প্রসাদ সাহার পরিচিতি হয় ‘দানবীর’ নামে৷

রণদা প্রসাদ প্রতিষ্ঠিত অবিভক্ত ভারত পরে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিষ্ঠানটি হল ২০ শয্যাবিশিষ্ট ‘কুমুদিনী ডিস্পেনসারি’ ৷ ১৯৪২ সালে নারী শিক্ষার জন্য তাঁর প্রপিতামহী ভারতেশ্বরী দেবীর নামে ‘ভারতেশ্বরী বিদ্যাপীঠ’ স্থাপন করেন৷ এটি বর্তমানে বাংলাদেশে ভারতেশ্বরী হোমস নামে সুপরিচিত৷ ১৯৪৩ সালে টাঙ্গাইলে কুমুদিনী কলেজ প্রতিষ্ঠা, পিতার নামে মানিকগঞ্জে দেবেন্দ্র কলেজ স্থাপন।

সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ গরীবদের উদ্দেশ্যে ব্যয় করার জন্য কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল নামে অলাভজনক প্রাইভেট কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা রণদা প্রসাদ৷ ১৯৪৭ সালে তৈরি হয় এই সংস্থা৷ দাতব্য সংস্থা তৈরি করে মহিলাদের উন্নয়নে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি৷ ব্যবসা সূত্রে পাকিস্তান আমলেই অত্যন্ত প্রভাবশালী হন৷

তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিনের পর দিন উত্তপ্ত হতে থাকে৷ আর পূর্ব পাকিস্তানে জুড়ে তৈরি হয় তীব্র পাক বিরোধী ক্ষোভ৷ সেই ক্ষোভ গিয়ে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয় ১৯৭১ সালে৷ বিরাট সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলি পরিচালনায় ব্যস্ত রণদা প্রসাদ সব কিছু ছেড়ে আর আসতে পারেননি৷ সেটাই তাঁর কাছে কাল হয়েছিল৷ প্রভাবশালী তকমাও তাঁকে বাঁচাতে পারেনি৷