কিছু দিন আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তিনি মাও সে তুংকে শ্রদ্ধা করেন৷ কোথা থেকে তাঁর এত শ্রদ্ধা এল, তা তিনিই জানেন৷ একটা সময় ছিল যখন দুধে দাঁত খসতে না খসতে বাচ্চারা এই বাংলায় ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ বলে চেঁচাত৷ রেড বুক হাতে নিয়ে ঘুরত৷ পুলিশের স্পাই বলে নিরীহ ফেরিওয়ালারও গলা কাটত৷ এমনকী, রেড বুককে সাক্ষী রেখে বিয়ে পর্যন্ত (নিন্দুকেরা বলে, বহুবিবাহও) করত৷ সেই সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়সও ছিল নিতান্ত কম৷ ফলে তখন তাঁর পক্ষেও অর্বাচীনের মতো চীনদেশের মাও সে তুংয়ের ভক্ত হওয়া বিচিত্র কিছু নয়৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী
নিখিলেশ রায়চৌধুরী

কিন্তু পরবর্তীকালে মাও সে তুংয়ের কীর্তিকলাপ সেদেশের অনেক কমিউনিস্টও যেভাবে ফাঁস করে দিয়েছেন তাতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাভক্তির ছিটেফোঁটাও বেজিংয়ের কমিউনিস্ট নেতৃত্বের বাইরে কেবলমাত্র সন্ত্রাসবাদী ছাড়া আর কারও পক্ষে কী করে থাকা সম্ভব, তা বোঝা দুষ্কর৷ এদেশে মাওবাদীদের কার্যকলাপ থেকে পরিষ্কার, তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী চক্রের নিবিড় যোগাযোগ আছে৷ না হলে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করার পর মাওপন্থীদের বস্তা বস্তা টাকা ধরা পড়ত না৷ বলা বাহুল্য, এই বস্তা বস্তা টাকা ‘জনগণে’র দেওয়া টাকা নয়৷ ভারতে যারা অশান্তি পাকাতে চায় তাদের পাঠানো টাকা৷ হয়তো দাউদ ইব্রাহিমের হাওয়ালা চ্যানেলেই তা নেপাল হয়ে এদেশে ঢুকেছে৷ এহেন অপরাধপ্রবণ জুলুমবাজ ও নাশকতাবাদীদের যিনি গুরুঠাকুর, সেই মাও সে তুং সম্পর্কে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এখনও এত শ্রদ্ধা বজায় রয়েছে কোন জাদুতে?

দুঃখের বিষয়, ভারতের কোনও রাজ্যের বিপুল ভোটে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী যদি এভাবে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে আধুনিক চীন তথা বিশ্বের অভিশাপ মাও সে তুংয়ের গুণকীর্তন করেন, তাহলে মাওপন্থী সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করাটা নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে আরও কঠিন হয়ে যায়৷ কেন জানি মনে হচ্ছে, মাও সে তুং সম্পর্কে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই অনেক ধরনের অপকর্ম ঘটছে এ রাজ্যে৷ ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, ওডিশা, তেলেঙ্গানার মতো রাজ্য যেখানে মাওবাদী দমনে সমন্বয় রেখে কাজ করছে সেখানে বাংলার পুলিশ-প্রশাসন সেই উদ্যোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে বলেই আমার আশঙ্কা৷ তার কারণ, এ রাজ্যের বর্তমান শাসককুলে অনেক ‘বর্ণচোরা’ মাওবাদী আছেন৷ আর তাঁদের বাঁচাতেই হয়তো এ রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকতে হচ্ছে৷ চাইলেও মাওবাদী উপদ্রবে ব্যতিব্যস্ত অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে তারা হয়তো ঠিকমতো সমন্বয় রাখতে পারছে না৷

অথচ, আবারও বলছি, মাওবাদী উপদ্রব কোনও বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়৷ নামে আলাদা হলেও তারা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কেরই আর একটি নাগপাশ৷ এখন এই নেটওয়ার্কের রাশ যেহেতু পুরোপুরি কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের মদতদাতাদের হাতে তাই তারাই পরোক্ষে আইএসের মগজধোলাইকারীদের পাশাপাশি এই মাওবাদী উপদ্রবেরও মূল চালিকাশক্তি৷ মাওবাদীদের ক্ষেত্রে এখানে সুবিধা হল, তারা যে কোনও ধর্মেরই নরনারী হতে পারে৷ আর তাই, চাইলে যে কোনও ভান এবং ভেকই অতি সহজে নিতে পারে৷ এদেশের মাওবাদীরা বেশিরভাগই হিন্দু, তাই তাদের প্রতি সন্দেহটাও তুলনায় অনেক কম৷ মুসলমান হলে তাদের উপর পুলিশ-প্রশাসনের যতটা নজর থাকে, মাওপন্থী হিন্দুদের উপর ততটা থাকে না৷ তারা অতি সহজে মন্দিরের সেবায়েত সাজতে পারে, মাথা নেড়া করে হরেকৃষ্ণ নামগান করতে পারে, ঝোলা ঘাড়ে লেখক-কবি বনে যেতে পারে, আবার ফুটপাথে গুমটি মুদিখানা খুলেও বসতে পারে৷ আবার দরকার পড়লে যে কোনও নাশকতা ও সন্ত্রাসের কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা জোগাতে পারে৷ ভুললে চলবে না, যে কোনও সন্ত্রাসেরই বচন এ-ক: মারো, কাটো, ভেঙে দাও, জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও৷ নিজেকে ঢাকতে সে ভোল যতই বদলাক, আসল উদ্দেশ্য থেকে সে কখনই বিচ্যুত হয় না৷

ঠিকই যে, ১৯৭০-এর দশকে এ রাজ্যে নকশাল আন্দোলনের বিভীষিকা ছিল মূলত সিপিএমের সন্ত্রাসেরই পালটা প্রতিক্রিয়া৷ কিন্তু সেই পালটা বিভীষিকার পরিণাম সাধারণ মানুষকেও ভুগতে হয়েছে প্রতি পদে৷ এখনকার মাওবাদীরা তাদেরই নবতর সংস্করণ৷ বর্তমান বিশ্বের যে কোনও সন্ত্রাসবাদী শক্তির মতোই এদেরও moral fibre-এর ভাঁড়ার নিট শূন্য৷ কোনও কোনও উদারতন্ত্রী বুদ্ধিজীবী যদি এদের সঙ্গে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের তুলনা করে সুখ পেতে চান, পেতে পারেন৷ কিন্তু তাঁরাও যেন মনে রাখেন, একবার এদের খপ্পরে পড়লে তাঁদের দশাও কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৭০-৮০-র দশকে উগ্র বামপন্থী তাণ্ডবে জেরবার ইতালির বহু অধ্যাপক-ইন্টেলেকচুয়ালের মতো হবে৷ যাদের জন্য তাঁরা গলা সাধছেন, তারাই পরে ব্ল্যাকমেল করে তাঁদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে৷

তা সে যাই হোক, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘উপদেশ’ কিংবা ‘পরামর্শ’ দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার নেই৷ শুধু একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে বলি, আলটপকা মন্তব্য করার আগে সাবধান হন৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ