কলকাতা: বাংলায় অভাবনীয় উত্থান বিজেপির। গত পাঁচ বছর আগে যখন গোটা দেশজুড়ে মোদী ঝড় চলছে তখনও বাংলায় বিজেপি ঝড় রুখে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাতে মাত্র দুটি আসন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বকে। কিন্তু পাঁচ বছরে আমূল পরিবর্তন বাংলায়। এক ধাক্কায় বিজেপির আসন বেড়ে ২ থেকে ১৮। শুধু তাই নয়, বিধানসভার নিরিখে হিসাব করলে ১২৮টি বিধানসভায় এগিয়ে রয়েছে বিজেপি।

যা কিনা অবশ্যই শাসকদল তৃণমূলের কাছে মাথাব্যাথার কারণ হিসাবেই মনে করছে রাজনৈতিকমহল। আর এই অবস্থায় ২০২১ সালেই বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন। যেভাবে ঘাড়ের কাছে বিজেপি নিঃশ্বাস ফেলছে তাতে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে তৃণমূলের কাছে। এরই মধ্যে কখনও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তো কখনও অর্জুন সিং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, ১০০ তৃণমূল বিধায়ক নাকি তাঁদের হাতে।

এর মধ্যে তৃণমূলের কাছে আরও আতঙ্কের বিষয় মুকুল রায়! বাংলায় যেভাবে বিজেপির উত্থান ঘটেছে তাতে অনেকের দাবি যে এর পিছনে মুকুল রায়ের হাত রয়েছে। এমনকি, দলের ভিতরে থেকেই তৃণমূল বহু নেতা-কর্মীই কার্যত পিছন থেকে ছুরি মেরেছেন বলে আশঙ্কা তৃণমূলের। শনিবারের সাংবাদিক বৈঠকে তা কার্যত স্পষ্ট নেত্রীর কথায়।

ফল প্রকাশের প্রায় ৪৮ ঘন্টা পর আজ শনিবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি দাবি করেন যে, বাংলায় প্রচুর টাকা ছড়িয়েছে বিজেপি। সাম্প্রদায়িক তাস খেলেছে বিজেপি। আর তা বলতে গিয়েই তৃণমূল নেত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দলের বহু নেতাও বিজেপির টাকা খেয়েছে! অর্থাৎ তাঁর দলের ভিতরেও যে ‘গদ্দার’ এখনও লুকিয়ে রয়েছে তা ভালোই বুঝতে পারছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেজন্যেই মমতার মন্তব্য, ‘অনেক কাজ করে ফেলেছি, এবার দলের জন্যে বেশি সময় দেব’। অনেকটাই খেদ নিয়েই এমন মন্তব্য করেন নেত্রী।

রাজনৈতিকমহলের মতে, একটা সময় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবথেকে বেশি যাকে বিশ্বাস করতেন তিনি হলেন মুকুল রায়। সুখ-দুঃখের সময় একসঙ্গে কাটিয়েছেন তাঁরা। নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে শুরু করে দিল্লির রাজনীতিতে মমতার উত্থানের ক্ষেত্রে মুকুল অনেকটাই ভরসা ছিল নেত্রীর কাছে। বাংলায় বাম সরকারের পতনের পর থেকে দলের আরও বড় দায়িত্বে আসেন মুকুল রায়। কার্যত তাঁর উপরেই ভরসা করে জনগনের কাজ করবেন বলে ব্রতী হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজনৈতিকমহলের একাংশ বলছে, এরপর থেকে সেই অর্থে দলের দিকে আর তাকাননি নেত্রী। সেই সময় তৃণমূলের চাণক্যের ভূমিকা নেন মুকুল। ভোটের আগে প্রশাসনিক রদবদলই হোক কিংবা দল ভাঙানোর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই অনেক কিছু পালটে যায়। দলের ভিতরে মুখ্যমন্ত্রী ভাইপো অভিষেকের উত্থান ঘটে। আর সেখানে কোথাও যেন ধাক্কা লাগে মুকুলের। তাঁর হাতে তৈরি দলে অন্যের উত্থান বোধহয় মেনে নিতে পারেননি তিনি। এরপর যখন অভিষেকের হাতে সমস্ত দলের রাশ চলে যাচ্ছে তা আর তৃণমূলের তৎকালীন চাণক্য মেনে নিতে পারেনি বলেই মত রাজনৈতিকমহলের।

আর এই অবস্থায় ২০১৭ সালে বিজেপিতে যোগ মুকুলের। আর বিজেপিতে যোগ দিয়েই অভিষেককে প্রথম টার্গেট করেন তৃণমূলের প্রাক্তন চাণক্য। এরপরেইবতার হুঁশিয়ারি ছিল, যে দলটা আমি নিজে হাতে তৈরি করেছি তা শেষ করে দেব। বিষয়টি প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও লোকসভা নির্বাচনে যেভাবে বাংলায় বিজেপির উত্থান ঘটল তাতে অবশ্যই চাপ বেড়েছে তৃণমূলের নেতৃত্বের। একাংশের মতে, তৃণমূল নেত্রীও সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন মুকুলের খেলাটা। তিনি হয়তো কোথায় বুঝেছেন যে মুকুলের হুঁশিয়ারি শুধুমাত্র ফাঁকা আওয়াজ নয়। আর তাই আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে কোনও রিস্ক নিতে চান না মমতা। নেত্রীর লক্ষ্য এবার আর বেশি মানুষের জন্যে কাজ নয়, দলের জন্যেই নিজেকে নিয়োজিত করা। সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর মন্তব্য, সব কাজই করে ফেলেছি। আর কি দরকার। এবার দলের জন্যে বেশি সময় দেব।