কলকাতা: ন্যানো বিরোধীদের হতাশ করে ফের বিক্রি বাড়াচ্ছে রতন টাটার স্বপ্নের ছোট্ট গাড়িটি৷ যেখানে কয়েক মাস আগে এই গাড়িটির বিক্রি তলানিতে ঠেকে বাজার থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিল ইদানিং সেখানে বাজারে ন্যানো গাড়ির চাহিদা আবার বাড়তে দেখা গিয়েছে৷ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর টানা এই তিনমাস ধরে গাড়িটির বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে ফের জায়গা করে নিচ্ছে টাটা ন্যানো৷

ভারতের গাড়ি প্রস্তুতকারি সংস্থাগুলির সংগঠন সিয়াম (সোসাইটি ফর ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার)-এর দেওয়া তথ্য অনুসারে ফের টাটার ন্যানো গাড়ি বিক্রি বাড়ছে৷ সেপ্টেম্বরে বিক্রি হয়েছিল ৩১টি গাড়ি৷ অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪টি গাড়ি এবং নভেম্বরে বিক্রি আরও বেড়ে গিয়ে অংকটা দাড়িয়েছে ৭৭টি৷

এমনিতে গত পাঁচ মাস ধরে যাত্রিবাহী গাড়ির বাজার ভাল নয়৷ ফলে এই মন্দা বাজারের হাত থেকে রেহাই পায়নি মারুতি, হুন্ডাই সহ বেশ কিছু গাড়ি সংস্থা৷ প্রভাব পড়েছে টাটা মোটর্সের গাড়ি বিক্রিতেও৷ গত জুন মাসে ন্যানো গাড়ি মাত্র তিনটি বিক্রি হওয়ায় এই গাড়ি উৎপাদন বন্ধ করার পরিকল্পনা নেয় এবং ওই মাসে মাত্র একটি ন্যানো গাড়ি উৎপাদন করেছিল টাটা গোষ্ঠীর এই সংস্থাটি৷ তখন ভাবা হয়েছিল ডিলারদের কাছে কেউ ন্যানো গাড়ির অর্ডার দিলে তখনই শুধু ওই গাড়ি তৈরি করা হবে৷

শহরাঞ্চলে ন্যানোর চাহিদা কমায় টাটার ডিলাররাও নতুন প্রজন্মের গাড়ির মডেলগুলি (Tiago, Tigor, Nexon, Hexa)বিক্রির জন্য ক্রেতাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন৷ অন্যদিকে এই এক লাখি গাড়ির ইতিমধ্যেই দাম বেড়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকা হয়ে যাওয়ায় ক্রেতারাও মুখ ফেরাচ্ছে৷ ফলে সানন্দের কারখানায় নতুন মডেলের গাড়ি উৎপাদনের দিকেই জোর দিতে চাওয়া হয়েছে৷ এক সময় ওই কারখানার ১০ শতাংশ ব্যবহৃত হলেও এখন প্রায় পুরো কারখানাটিই কাজে লাগান হচ্ছে৷ আগে এক শিফটে কাজ হলেও এখন তিন শিফটে কাজ হচ্ছে যাতে বছরে ১,৫০,০০০গাড়ি তৈরি করা যায়৷

প্রথমে সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির কারখানা হবে বলে ঠিক হয়৷ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য চেয়েছিলেন টাটা গোষ্ঠীকে দিয়ে ন্যানো গাড়ি তৈরির কারখানা গড়ে তুলতে। কারখানা জন্য জমি নিতে গেলে অনিচ্ছুক কৃষকরা বাধা দেয়৷ সেই সময় বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এই অনিচ্ছুক কৃষকদের সমর্থনে আন্দোলনের নেমে পড়েন৷ যার জেরে সিঙ্গুর থেকে তখন গুজরাতের সানন্দে গাড়ি প্রকল্প সরিয়ে নিতে চান তৎকালীন টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান রতন টাটা৷ আর তা দেখে তৎকালীন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টাটা গোষ্ঠীকে গাড়ির কারখানা খোলার জন্য সাদরে আহ্বান জানান৷

এর পরে ২০১০ সালে সানন্দ থেকেই ন্যানো গাড়ি আত্মপ্রকাশ করে৷ কিন্তু ওই কারখানা থেকে বিতর্কিত এই ন্যানো গাড়ি বের হলেও বার বারই টাটারা এই গাড়িটি নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছেন৷ তাছাড়া তেমন বাজারও ধরতে পারেনি বরং চাহিদা কমায় ন্যানো উৎপাদন বন্ধের পথটাই বেছে নিতে হয়৷

এদিকে ২০১১ সালে রাজনৈতিক পালা বদলের ফলে এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার৷ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মমতা পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো সিঙ্গুরে কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হন৷ কিন্তু তা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যায় টাটা গোষ্ঠী৷ শেষমেশ আদালত মমতার পক্ষে রায় দেয়৷ শুরু হয় জমি ফিরিয়ে দিয়ে ফের চাষবাসের প্রক্রিয়া৷ কিন্তু বাস্তবে তা কি আদৌ চালু করা গিয়েছে – এটাই এখন প্রশ্ন তুলেছেন বামেরা৷

রাজনৈতির দিক থেকে মমতার জয় হলেও সিঙ্গুরের মানুষের জীবনে সুদিন ফেরেনি বলেই অভিমত ওখানকার এক দল মানুষের ৷ তাছাড়া অনেকেরই মনে হয়েছে কারখানা হলে চাকরি হত, তা না হওয়ায় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হল৷ আর সম্প্রতি ওইসব মানুষের ক্ষোভকেই কাজে লাগিয়ে লঙ মার্চের আয়োজন করতেও দেখা গিয়েছে বাম কর্মী,সমর্থকদের৷ অনেক দিন পরে বামেদের ওই লঙ মার্চে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করে ফের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির পাশাপাশি বামেদের আক্রমণ করা শুরু করেছেন৷ যেখানে ইদানিং বামেদের আর কোন অস্তিত্ব নেই এবং বিজেপি-কে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে মূলত মোদী- অমিত শাহ-দিলীপ ঘোষেদের গত কয়েক মাস ধরে সমালোচনা করতেই দেখা যেত৷

সিঙ্গুরই বাম রাজত্বের অবসান ঘটিয়েছে৷ আবার সম্প্রতি কিছুদিন ধরে সেই সিঙ্গুরকে সামনে রেখেই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে বামেরা৷ সেখান থেকে ৫২কিমি রাস্তা লাল ঝান্ডা নিয়ে পায়ে হেঁটে শিল্প আর কাজের দাবিতে কলকাতা পর্যন্ত এই লঙ মার্চ করা গিয়েছে৷ তবে গত নভেম্বরে যখন বামেরা সিঙ্গুরে চাষিদের নিয়ে লঙ মার্চের আয়োজন করেছিল তখন ন্যানো বিরোধী মমতার সমর্থকরা কটাক্ষ করতে থাকে- ওই গাড়ি তো কেউ কেনে না, সানন্দে ওই গাড়ি উৎপাদন হয় না ইত্যাদি বলেই৷

কিন্তু গত তিনমাস ধরে ন্যানো বিক্রির হিসেব অবশ্য অন্য কথা বলছে৷ এমন তথ্য জানাজানি হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ সেই সব ন্যানো বিরোধীদের হতাশ করবে তা বলাই বাহুল্য৷ আর উল্টে নতুন করে উজ্জীবিত করবে ন্যানো সমর্থকদের৷