সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খাদ্যের যোগান স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প খাবার ভাত ডালে আলুভাতে খেয়ে থাকতে বলেছিলেন। আজ থেকে বছর পঞ্চাশ আগে এই রাজ্যেরই এক মুখ্যমন্ত্রী খাদ্য সঙ্কট ঠেকাতে বিকল্প খাবার হিসাবে কাঁচকলার কথা বলেছিলেন। শুরু হয়েছিল ব্যাপক বিতর্ক। মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন হয়ে গিয়েছিলেন কাঁচকলা মন্ত্রী। সেই সময় চালের শত অভাবের মাঝেও চাল সরবরাহ বন্ধ হয়নি ঘরে ঘরে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চ্যালেঞ্জ এখন এটাই। শত সমস্যার মাঝেও দু-মুঠো চালের অভাব না হতে দেওয়া।

লকডাউনে সমস্যা সবথেকে বেশি দিন আনি দিন খাই মানুষদের। করোনার জেরে লকডাউনে যেমন আজও যেমন খাদ্যোৎপাদন বন্ধ নেই, সেইনও ছিল না। খাদ্য বস্তু কম উৎপাদন হয়েছিল। সেদিন হঠাৎই তৈরি হয়েছিল চালের হাহাকার। রুটি, পাউরুটিতে অন্যভস্ত বাঙালির প্রানান্তকর অবস্থা হয়েছিল। এদিকে লকডাউন যখন বৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলছে তখন সমস্ত রকম খাদ্য মজুদ থেকেও অর্থের অভাবে সমস্যায় পরতে পারে সাধারণ মানুষ। ঘটনা হল ষাটের দশকে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন শত চালের হাহাকারের মাঝেও রাজ্যে চাল সরবরাহ বন্ধ হতে দেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সেটাই করতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। গরীবদের জন্য খাদ্যের যোগান রাখতে হবে সর্বদা। সে যে ভাবেই হোক।

তখন চালের দাম বেড়ে প্রতি কিলো পাঁচ টাকা হয়ে গিয়েছিল। আজকে যেমন ম্যান মেড ক্রাইসিসের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সেই সময়েও তেমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। বিত্তশালি শহরের মানুষ চাল সব কিনে পারে এমন আশঙ্কা ভুগছিল গ্রাম। দূর্ভিক্ষের পরিবেশের সৃস্টি হতে পারে এই ভেবেই শেষের দিন গুনছিলেন। আশঙ্কার গন্ধ পেয়েছিল প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ক্ষয়িষ্ণু জনপ্রিয়তার কংগ্রেস সরকারও। গ্রামের লোকদের অনাহারে রেখে যাতে শহরে কেউ চাল আনতে না পারে তার জন্য কলকাতা ঘিরে কড়া পুলিশ পাহাড়া বসানো হয়েছিল।

কলকাতার বাসিন্দাদের জন্য চালু হয়েছিল কম্পালসারি রেশনিং ব্যবস্থা। প্রত্যেকের জন্য রেশনে চাল ,চিনি, গম বরাদ্দ হল। চাল ছিল মিহি, অতিমিহি, মোটা প্রভৃতি বেশ কয়েক রকমের। তাতেও সহজে কাটেনি আশঙ্কার মেঘ। একদিকে বাম আন্দোলন, অপরদিকে মানুষের খিদে মেটানোর চিন্তায় জর্জরিত মুখ্যমন্ত্রীর এক বক্তব্যে মহাবিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। খাদ্যাভ্যাস পাল্টাবার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেছিলেন ভাতের সঙ্গে রুটি, আলু, কাঁচকলাটাও খেতে। সবগুলিতেই ফাইবার, আয়রন, কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। শুরু হয়ে গিয়েছিল পাল্টা রাজনীতি। মুখ্যমন্ত্রীকে কাঁচকলা মন্ত্রী বলে ব্যঙ্গ শুরু হয়ে যায়।

হিসাবে গড়মিল দেখিয়ে চালের কালোবাজারিও হতে শুরু করেছিল। শিয়ালদহ ষ্টেশনের কাছে গলিতে রাতের দিকে চাল বিক্রি হত। বিক্রেতারা সবাই মহিলা। চাল বিক্রি হত কোটো মাপে। চার কোটো মানে এক কেজি বলে ধরত। হাওড়া বা শিয়ালদা ষ্টেশন গামী ট্রেনে চাল বোঝাই হত পুলিশের নজর এড়িয়ে বা পুলিশকে নজরানা দিয়ে । চাল বোঝাই করা হত ছোট পাশবালিশের খোলের মধ্যে। মোটা ব্যাগটা কোমর থেকে ঝোলান থাকত এমনভাবে যাতে কেউ বুঝতে না পারে সঙ্গে চাল রয়েছে। বাকি চাল ট্রেনের কামরার দেওয়ালের খাঁজে, সিটের ফাঁকে ,মেঝের পাটাতন সরিয়ে রেখে আনা হত।

চালপার্টির দাপটে ট্রেনের পাখা ,লাইট, সিট সমস্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ওই চাল পার্টির দাপটে বর্ধমান শিয়ালদহ ‘সিসিআর’ ট্রেন রেল কর্তৃপক্ষ তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। ষ্টেশনে ষ্টেশনে চালের এই চোরাচালান রোখবার জন্য পুলিশ থাকা স্বত্বেও চলত চোরাচালান। মহিলারা এই কাজ বেশি করছিল দেখে স্টেশনে মহিলা পুলিশ নিয়োগ করা হয়েছিল। পুলিস ও চালউলিদের মধ্যে ধস্তাধস্তি নিত্য দৃশ্য হয়ে উঠেছিল। ট্রেনের নিত্য যাত্রীদের সহানুভুতি কিন্তু চাল পার্টিদের দিকেই থাকত। বাজারে এসেছিল ভুট্টা ও আমেরিকার মাইলো। তা বাঙালির সহ্য হচ্ছিল না। অনেকের সহ্য হলেও তাতে খিদের অভাব মিটছিল না। বাস্তব হল এত কিছুর মাঝেও একদিনের জন্যও চাল সরবরাহ বন্ধ হয়নি।

যেদিকে পরিস্থিতি এগোচ্ছে তাতে দিন আনি দিন খাইদের সমস্যা প্রবল হতে পারে। দু’মুঠো চাল আলুর প্রয়োজন। সেই যোগান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার করে যাচ্ছে বটে কিন্তু এটা যেন কোনওভাবে থমকে না যায়। সেদিকে নজর রাখতে হবে, না হলে অনাহারে গরীবদের প্রাণ যেতে পারে। তুলনা টেনে বলা যেতেই পারে, মমতার লড়াই এখন কাঁচকলা মন্ত্রী হয়ে ওঠা, যিনি শত সমস্যাতেও মানুষকে ভুখা পেট থাকতে দেননি।