রানা দাস: ২৩ মে লোকসভার ফলাফল প্রকাশ। দু’দিন মৌনব্রত। বলা যেতে পারে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। তারপর হতাশাজনক ফল নিয়ে দলের অন্দরে পর্যালোচনা। মাত্র একঘণ্টার চুলচেরা বিশ্লেষণ। বন্ধঘরে অভিযোগ। পালটা অভিযোগ। অভিমান। একে-অপরের প্রতি দোষারোপ। নিজের হাতে গড়া দলের কাছে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ইচ্ছে প্রকাশ। সবশেষে সাংবাদিক বৈঠক। আর তাতেই লোকসভার ভোটের পর দলের কার্যত ‘কঙ্কালসার’ সাংগঠনিক অবস্থা প্রকাশ্যে চলে এল।

লাইভ চলা নিউজ চ্যানেলগুলির সামনে একের পর বিস্ফোরক মন্তব্য করে ফেললেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার ২০ বছরের সাংবাদিকতার জীবনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এতটা হতাশ হতে আগে কোনোদিন দেখিনি। বাংলার অগ্নিকন্যাকে দেখেছি তাঁর কতটা মনের জোর। সেই দৃঢ়তা কেন জানি আচমকা উধাও হয়ে গেল মমতার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। অনেকটা যেন যুদ্ধের আগেই হার স্বীকার করে নেওয়া।

রানা দাস
এডিটর-ইন-চিফ
কলকাতা24×7

মমতার এদিনের সাংবাদিক বৈঠক দলের কতটা ক্ষতি করল, তা হয়ত নেত্রী বুঝে ওঠার মতো মানসিক পরিস্থিতিতে নেই। আর তারপরই ফলাফল বিশ্লেষণ করে সেইদিন বিভিন্ন জেলা সভাপতি পরিবর্তন করে আখরে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তিকে বেশ কিছুটা দুর্বল করে দিল। দলের মধ্যে যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তা তিনি নিজে মুখে স্বীকার করে ফেলেছেন একটা মন্তব্যেই। লোকসভার ভোটের ফলাফল প্রকাশের এত অল্প সময়ের মধ্যে এটা প্রকাশ না করলে দলের নিচু এবং মাঝারিতলার কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়ত না। মমতার এদিনের সাংবাদিক বৈঠকের পর কর্মীদের মনোবল কতটা তলানিতে ঠেকেছে, সেটা দিন-দু’য়ের মধ্যেই টের পাওয়া যাবে। তার পর একের পর জেলা সভাপতিকে ভরসার তালিকা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে আরও একটা ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আসলে ওনাকে আমি কাছ থেকে দেখে যতটা দেখেছি এবং নানা ভাবে জেনেছি, তাতে তিনি খুব তাড়াতাড়ি সবাইকে বিশ্বাস এবং ভরসা করে ফেলেন। তার থেকে বড় কথা এই সহজ-সরল মানুষটি কোন বিষয়ের অন্দরে না গিয়ে কান দিয়ে দেখেন। মূল কথা অন্যের কথা খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে নেন। আর চটজলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। শনিবারে সাংবাদিক বৈঠকে বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব প্রাপ্তদের নাম ঘোষণার সময় দেখলাম নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কান্ডারী শুভেন্দু অধিকারীর উপর রীতিমতো ভরসা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যা।

বাম আমলে যে শুভেন্দুকে জঙ্গলমহলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর হাত ধরে জঙ্গলমহলে তৃণমূলের সংগঠন বাড়ানো হয়েছিল, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর সেই শুভেন্দুকেই জঙ্গলমহলের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফল কী হল? এবারের লোকসভা ভোটে ঝাড়গ্রামের ফলাফল বলল, তৃণমূলের সংগঠন জঙ্গলমহলে তলানিতে এসে ঠেকেছে। আর তাই সেই শুভেন্দুকে আবার ঝাড়গ্রামের দায়িত্ব দেওয়া হল। আমি যতদূর জানি এই শুভেন্দুকে ‘দিদি’র কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কী ধরণের রাজনীতি করা হয়েছিল। মমতা-শুভেন্দু সম্পর্ক খারাপ করার পিছনে যে দু’জনের নাম উঠে আসে, তা জানলে অবাক হতেই হয়। বঙ্গ-বিজেপির আজকের অন্যতম ‘চানক্য’ মুকুল রায় আর তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কাঁথির ছেলে শঙ্কুদেব পন্ডার নামই বার বার উঠে এসেছে। তার জন্য একটা ছোট্ট ঘটনা পাঠকদের জানাতেই হচ্ছে।

সালটা ২০০৭। আমি তখন বর্তমান পত্রিকার পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রিপোর্টার। ২০০৬ সালের নভেম্বর মাস থেকে টানা নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের খবর করে যাচ্ছি বর্তমান পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্তের নির্দেশে। আমাকে পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে পূর্ব মেদিনীপুরে বদলি করার সময়ই বলা হয়েছিল নন্দীগ্রামের জমি নিয়ে টানা খবর করতে হবে। ২০০৬ সালে আমি যখন নন্দীগ্রামের জমি নিয়ে খবর করছি একের পর এক। তখন বাংলার কোনও সংবাদমাধ্যমই সেই খবর ধরেনি। সবার টনক পড়ে ২০০৭ সালের ৩ জানুয়ারি নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলি চালনার ঘটনার পর। সে কথা ছেড়ে মূল বিষয়ে আসছি।

২০০৭ সালের নভেম্বর মাসের ১০ তারিখ নন্দীগ্রামের হারানো জমি উদ্ধারে সুশান্ত ঘোষ-তপন-শুকুরকে মাথায় রেখে অপারেশন সূর্যোদয় চালায় সিপিএম। খেঁজুরির দিক থেকে দুই ভাগে ভাগ হয়ে সিপিএমের ক্যাডাররা গোকুলনগর এবং সোনাচূড়া পর্যন্ত দখল নেয়। সেই ঘটনার পর এখনও বেশ কয়েকজন জমি আন্দোলনকারী নিখোঁজ রয়েছে। সিপিএমের এই অভিযানে নন্দীগ্রাম হাতছাড়া মতো অবস্থা হয় তৃণমূল কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত জমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি। কেন্দ্রে তখন মনমোহন সিং নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। নন্দীগ্রামের জমি সিপিএমের দখলে চলে যাচ্ছে দেখে কেন্দ্রীয় সরকার একটি সংসদীয় দল পাঠায়।

নভেম্বর মাসের সেই দিন। বিজেপির প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদবানী নেতৃত্বে সংসদীয় প্রতিনিধিদের নন্দীগ্রাম আসার কথা। সেই দলে ছিলেন সেই সময়ের তৃণমূল সাংসদ মুকুল রায়ও। আমি সেই দলের কনভয়ের সঙ্গে নন্দীগ্রাম যাব বলে কোলাঘাট ব্রিজে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছি। এমন সময় বর্তমান পত্রিকার বর্ধমান ব্যুরো চিফ পুলকেশ ঘোষ মোবাইলে ফোন করে বলেন, তুমি এখন কোথায়? আমি বললাম কোলাঘাট ব্রিজে অপেক্ষা করছি, সংসদীয় দলের সঙ্গে নন্দীগ্রাম যাব। উত্তরে পুলকেশদা বললেন, তোমাকে যেতে হবে না।

কারণ জানতে চাইতেন তিনি বললেন, এটা বাবুর নির্দেশ। (আমরা পিছনে বর্তমান পত্রিকার সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্তকে ‘বাবু’ বলেই সম্মোধন করতাম)। সেন্ট্রাল আইবি’র রিপোর্ট তুমি নন্দীগ্রামের মাটিতে পা রাখলে তোমাকে কচুকাটা করা হবে। তোমার ছবি সিপিএম পার্টি অফিসগুলিতে দেওয়া হয়েছে। তাই বাবু চান না তুমি নন্দীগ্রামে যাও।” আমি জানতাম টানা প্রায় দুই বছর ধরে নন্দীগ্রামে পরে থেকে একের পর এক এমন কিছু নিউজ করেছিলাম, যাতে কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের ম্যানেজাররা খুবই সমস্যা পড়েছিল। কিন্তু সেটা যে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটা কল্পনা করিনি। আমি সংসদীয় দলের সঙ্গে নন্দীগ্রাম যাবই, রীতিমতো নাছোড়বান্দা ছিলাম। পুলকেশদাকে বললাম, এতদিন আমি কাজ করলাম সেখানে গিয়ে আজকের দিনটা যাব না, এটা হতে পারে না। যা হয় হবে, আমি যাবই। আমি একগুঁয়ে মনোভাব নিতেই পুলকেশদা বললেন, দাঁড়াও আগে বরুণবাবুর অনুমতি নিতে হবে। এই কথা বলে তিনি ফোন কেটে দিলেন।

কিছুক্ষণ বাদেই আমাকে তিনি ফোন করে বললেন, বরুণবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি অনুমতি দিয়েছেন, তবে একটা কথা যে কোনভাবে আদবানীজির কাছে গিয়ে শুধু একবার বলবে, “বরুণবাবু নে আপ কো ইয়াদ কিয়া”। আর কিছু করতে হবে না। আমি জানতাম বরুণবাবুর সঙ্গে আদবানীজির একটা গভীর সম্পর্ক আছে। বরুণবাবু এই কথা বলতে বলেছেন মানে, কোন একটা গেম প্ল্যান তিনি করেছেন আদবানীজির সঙ্গে কথা বলে।

পাঠকরা ভাবছেন, এই প্রতিবেদনের সঙ্গে এই ঘটনার কী সম্পর্ক? হ্যাঁ, একটা সম্পর্ক আছে। সেদিন আমি এমন একটা ঘটনার সাক্ষী ছিলাম, যাতে স্পষ্ট হয়, মুকুল রায় কী ভাবে শুভেন্দুর সঙ্গে মমতার সম্পর্কে তিক্ততা বাড়িয়েছিলেন। তো সেদিন কোলাঘাট থেকে আমি লালকৃষ্ণ আদবানী, সুষমা স্বরাজ, এস এস আলুয়ালিয়া, মুকুল রায়-সহ প্রায় ১০ জনের সংসদীয় দলের কনভয়ের পিছন পিছন নন্দীগ্রামে পৌঁছয়। সোনাচুড়া বাজারে দাঁড়িয়ে আদবানীজি গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। সেই সুযোগে আমি ওঁনাকে বললাম, “বরুণবাবু নে আপ কো ইয়াদ কিয়া”। কিছু পরেই দেখলাম তিনি এসপিজির একজন কিছু একটা বললেন।

তারপর সংসদীয় দলের গোটা নন্দীগ্রাম সফর চলাকালীন আমি কোন না কোন ভাবে এসপিজি’র ঘেরাটোপের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি, আমাতে রীতিমতো ফলো করা হচ্ছে। আদবানীজি খুব কাছে কাছে ঢুকে যাচ্ছিলাম। তখন আমি মুকুল রায় সহ বাংলার রাজনৈতিক নেতার কাছে আদবানীজি জানতে চান, কে এই শুভেন্দু? কে শিশির অধিকারি? ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট শাসনের পরেও কী করে কাঁথি পুরসভা এরা দখল করে আছে। সেদিন আদবানীজি একবারও মমতার নাম নেননি। আদবানীজির এই কথা কালিঘাটে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল অন্যভাবে। মমতাকে বোঝানো হয়েছিল, শুভেন্দু কিন্তু বিজেপিতে যাচ্ছে। ওকে বেশি ভরসা করা যাবে না। এই বার্তাই কাল হয়েছিল। শুভেন্দুর সঙ্গে মমতার সম্পর্কে তিক্ততা বেড়েছিল। কারণ সেদিন মমতা অন্যের মুখ দিয়ে দেখেছিলেন। যাকে ভরসা করে শুভেন্দু খারাপ হয়েছিল, সেই চানক্যই কিন্তু এবারের লোকসভায় তৃণমূলের ভরাডুবির অন্যতম কারণ।

শনিবারের সাংবাদিক বৈঠকের আগে দলের পর্যালোচনা সভায় মমতা সম্ভবত সেই একই ভুল করলেন বলে মনে হচ্ছে। না হলে, দুর্দিনে দলের পাশে থাকা মানুষগুলোর উপর থেকে কেন ভরসা রাখতে পারলেন না। তার সব থেকে বড় উদাহরণ দক্ষিণ দিনাজপুরের অপসারিত জেলা সভাপতি বিপ্লব মিত্র। ২০০৪-০৫ সালের বর্তমান পত্রিকার দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সংবাদদাতা হয়ে কাজ করার সময় দেখেছি, সিপিএম-আরএসপির রমরমা থাকা ওই বালুরঘাট-গঙ্গারামপুরে একা বিপ্লব মিত্র দলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। ঘরের টাকা খরচ করে দলের সভা-সমিতি করেছেন। আর দুর্দিনের সেই নেতাকেই দলের পদ খোয়াতে হল। হয়তো এমন আরও দুর্দিনের সৈনিকের উপর কোপ পড়ল এদিন। এর প্রভাব কিন্তু ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে।

দু’একদিনের মধ্যে সেটা আরও প্রকোট হতে শুরু করবে। একটা লোকসভার ফলাফল প্রকাশের পরেই এত চটজলদি এত কড়া পদক্ষেপ না নিলেও পারতেন তৃণমূল সুপ্রিমো। আরও কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরাটা উচিত ছিল বলেই মনে হয়। আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটাই মনে একজন বিচক্ষণ রাজনেতার করা উচিত। এমন যেন না হয়, দুর্দিনের সৈনিকদের অবিশ্বাস করে তৃণমূলের কফিনে পেরেক ঠুকলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।