প্রতীতি ঘোষ, বারাকপুর: একদা দলের দুই নম্বর ব্যক্তি মুকুল রায়ের খাস তালুকে সভা করলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম না করে কড়া ভাষায় আক্রমন করেছেন তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতাকে।

এদিন কাঁচরাপাড়ায় মুকুল রায়ের পাড়ায় দাড়িয়ে নাম না করে মুকুল রায়ের তীব্র সমালোচনা করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনি বলেন, “ওই গদ্দারদের বিশ্বাস করে ছিলাম আমি। দলের অনেকেই আমাকে ওদের বিষয়ে সতর্ক করে ছিল। আমি একটু মানবিক, তাই ওদের বিশ্বাস করে ছিলাম। কিন্তু আমি ভুল করেছিলাম। এর দায় আমার।”

এখানেই শেষ হয়ে যায়নি একদা প্রিয় ভাই মুকুলের প্রতি দিদি মমতার আক্রমণ। তিনি বলেন, “ছিল তো ছোটখাট একজন কন্ট্রাক্টর। এখন ব্যাংকক, থাইল্যান্ড, দুবাই যাচ্ছে। কি ভাবে, আমি কিছু জানি না? সব খবর আছে। এই কল্যাণী রোডের পাশে এত জমি সব কার নামে? কি করে হল? সব খবর আছে। আগে তো সিপিএম করত, পরে আমাদের দলে এসেছিল।” এরপরেই তিনি বলেন, “ওর সিপিএমে হাতে খড়ি, তৃণমূলে গড়াগড়ি আর এখন বিজেপিতে সুড়সুড়ি। এই সব গদ্দাররা যত তাড়াতাড়ি দল থেকে বিদায় নেয়, ততই ভালো। দল আমার শুদ্ধ হবে। বাকি যারা আছে তাদের বলছি ৭ দিন সময় দিলাম, এর মধ্যে যে যে যেতে চান, চলে যান। ওরা এখানে বাঙালিদের ঘর ভেঙেছে, মারছে, অত্যাচার করছে। কি ভেবেছে, বাংলায় থেকে বাঙালিদের উপর অত্যাচার মেনে নেব না। এখানে বাঙালি বিহারি, বাঙালি মুসলিম করতে দেব না। বাংলায় গুণ্ডাদের কোন স্থান নেই।”

মুখ্যমন্ত্রী কাঁচরাপাড়ায় এসে জানতে পারেন বিজেপি তৃণমূলের সমস্ত পতাকা, ফ্লেক্স সব ছিড়ে দিয়েছে। এতেই রেগে গিয়ে বীজপুর থানার পুলিশকে ধমক দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “পুলিশকে বলব ঠিক করে কাজ করুন। আমাদের সব পতাকা, ফ্লেক্স ছিঁড়ে দিয়েছে। কত বড় সাহস, বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়ে এসেছে যাতে কেউ সভায় না আসতে পারে। পুলিশ কি করছে? তিন দিনের মধ্যে অ্যারেস্ট করুন দোষীদের।”

কাঁচরাপাড়ার কর্মীসভায় দাঁড়িয়ে এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে এক হাত নিয়ে বলেন, “ওরা টাকা দিয়ে ভোট লুঠ করেছে । ইভিএম মেশিন আগে থেকেই প্রোগ্রামিং করা ছিল। তাই ইভিএম মেশিনে ভোট চাই না। আগামী ২১ শে জুলাই সমাবেশ থেকে আমাদের আন্দোলনের শপথ হবে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিতে হবে । তাই ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটে ভোট ফিরিয়ে আনতে হবে।”

কাঁচরাপাড়ার মিলননগর আদর্শ সংঘের মাঠে কর্মীসভা করতে এসে নিজের বক্তব্যের শুরুতে এই ভাষাতেই বিজেপিকে কটাক্ষ করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, “বাংলায় থাকতে হলে বাংলার সভ্যতা সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা যাবে না। বাংলাকে ভালবাসতে হবে। বাংলা ভাষায় কথা বলতে হবে। সবার মাতৃভাষাই সবার কাছে প্রিয়। আমি কোন ভাষাকেই ছোট করছি না। তবে বাংলায় থেকে বাঙালি হঠাও চলবে না। বাংলা কি বিজেপির গুন্ডাদের হাতে চলে যাবে? বাংলাকে কিছুতেই গুজরাত হতে দেব না। এই বাংলার নৈহাটিতে জন্ম গ্রহন করে বন্দেমাতরম গান লিখেছিলেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালি হিসেবে বঙ্কিম চন্দ্রের অবদান অনস্বীকার্য। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কখনোই বলেননি বোমা মারুন। মহাত্মা গান্ধী গুজরাতের বাসিন্দা ছিলেন। তবে উনি জীবনের সব থেকে বেশী সময় এই বাংলাতেই কাটিয়েছেন। গান্ধীজি গুজরাতের বাসিন্দা ছিলেন বলে অমিত শাহ আর গান্ধীজি সমান সেটা ভাবার কোন কারণ নেই।”

বিজেপির পাশাপাশি এদিন সংবাদ মাধ্যমের সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “ওরা আমাকে যত গাল দেবে, তত বেশি শক্তি বাড়বে আমাদের। ওদের এটা ব্যবসা। তবে সাংবাদিকদের কেউ গায়ে হাত দেবেন না। ওরা চাকরি করে। ওদের কিছু করার নেই। আমার সমালোচনা করুক। আমি তো রামদেবজীর মত অত টাকার বিজ্ঞাপন দিতে পারব না। বিজেপি টাকা দিয়ে সব কিনতে চাইছে। এবার ভোটে ২৭ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। আমার অত টাকা নেই। মানুষই আমার শক্তি।”

দলের সংগঠন মজবুত করার জন্য অতি সাধারণ ছেলেমেয়েদের দলের কাজে লাগানোর জন্য কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন তৃণমূল নেররী তিনি বলেছেন, “পাড়ায় যারা আড্ডা দেয়, তাদের দলে কাজে লাগাতে হবে। তাদের কাজের ব্যবস্থা আমরা করব।” বাংলার সঙ্গে বিজেপি শাসিত রাজ্যের তুলনা করে তিনি বলেন, “উত্তর প্রদেশে ভোটের পরে ৫০ জনেরও বেশি খুন হয়েছে, এনকাউন্টার করে মারা হয়েছে। আমাদের রাজ্যে ১১ জন মারা গেছে, তাদের মধ্যে ৯ জন আমাদের দলের বাকি দুজন বিজেপির। আমি আমাদের দলের মৃতদের পরিবারের সবার চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। বিজেপির যে দুজন মারা গেছে, তারাও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদেরও পরিবারের সদস্যদের চাকরির ব্যবস্থা করব। এক্ষেত্রে আমি রাজনীতির রঙ দেখব না।”

এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ডাক দেন । এদিন মুখ্যমন্ত্রীর এই কর্মীসভায় রাজ্য সভার তৃণমূল সাংসদ দোলা সেন, খাদ্যমন্ত্রী তথা জেলা তৃণমূল সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, বিধায়ক নির্মল ঘোষ, তাপস রায়, পার্থ ভৌমিক, সুনীল সিং সহ কয়েক হাজার কর্মী সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেলিকপ্টারে করে কাঁচরাপাড়ায় পৌঁছান।

এদিন মুখ্যমন্ত্রী হেলিকপ্টার থেকে নেমে নিজের গাড়ি করে সভাস্থলে উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সভাস্থলে যাবার সময় রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা বিজেপি সমর্থকরা বিজেপির পতাকা হাতে মুখ্য মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে জয় শ্রী রাম স্লোগান দিতে থাকেন। কিন্তু আজ এই স্লোগান শুনেও কনভয় না থামিয়ে নিজের সভার উদ্দ্যেশে চলে যান মুখ্য মন্ত্রী।