সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : মহাজাতি সদন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে মধ্য কলকাতার এই প্রেক্ষাগৃহ। মহাত্মা গান্ধী রোড মেট্রো স্টেশনের পাশে অবস্থিত। আজ নিয়মিতভাবে বাংলা নাটক মঞ্চস্থ হয় সেখানে। সেমিনার হলে সেমিনার আয়োজিত হয়, যার মূল ভাবনা ছিল নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর। সেই নেতাজী দেশত্যাগ করতেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মহাজাতি সদনের নির্মাণ কাজ।

১৯৩৭ সালের মে মাস। সুভাষচন্দ্র বসু ও তাঁর বন্ধু অ্যাডভোকেড নৃপেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, সুভাষচন্দ্রের এলগিন রোডের বাড়িতে স্থানীয় যুবকদের একটি সভা ডেকেছিলেন। এই সভায় সুভাষচন্দ্র কলকাতার নাগরিকদের সভাসমিতি ডাকার উপযুক্ত একটি বড় প্রেক্ষাগৃহ স্থাপনের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন। এর কিছুদিন পর সুভাষচন্দ্র মধ্য কলকাতায় সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ও হ্যারিসন রোডের (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী রোড) সংযোগস্থলের কাছে কলকাতা পৌরসংস্থার ৩৮ কাঠা জমির সন্ধান পান।

এই স্থানটিই সুভাষচন্দ্র প্রস্তাবিত প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের জন্য নির্বাচন করেন। তাঁর আবেদনে পৌরসংস্থা ১ টাকা লিজে জমিটি সুভাষচন্দ্রকে দিয়ে দেয়। সুভাষচন্দ্র প্রস্তাবিত প্রেক্ষাগৃহের নামকরণের জন্য অনুরোধ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। রবীন্দ্রনাথ প্রেক্ষাগৃহের নামকরণ করেন ‘মহাজাতি সদন’। শান্তিনিকেতনের বিশিষ্ট স্থপতি সুরেন্দ্রনাথ কর মহাজাতি সদনের নকশা তৈরির দায়িত্ব পান। সুভাষচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকেই এই প্রেক্ষাগৃহের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুরোধ জানান। ১৯৩৯ সালের ১৯ অগস্ট সুভাষচন্দ্র প্রমুখ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ মহাজাতি সদনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।

১৯৪১, মহানিষ্ক্রমণ সুভাষের। তিনি দেশত্যাগ করতেই মহাজাতি সদন নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ফেরার ঘোষণা করে এবং তাঁর নামে থাকা মহাজাতি সদনের জমিখণ্ডটির লিজও বাতিল করে দেয়। সুভাষচন্দ্রের দাদা শরৎচন্দ্র বসু ও নৃপেন্দ্রচন্দ্র মিত্র সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করেন। আদালতের রায় লিজ বাতিল বেআইনি ঘোষিত হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয়। ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ‘মহাজাতি সদন বিল’ পাশ হয়। এরপর তদনীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় মহাজাতি সদন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ১৯৫৮ সালের ১৯ অগস্ট তিনিই মহাজাতি সদনের দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন।

এই মহাজাতি সদনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আজ এই মহাজাতি সদনে আমরা বাঙালী জাতির যে শক্তি প্রতিষ্ঠা করবার সংকল্প করেছি তা সেই রাষ্ট্রশক্তি নয়, যে শক্তি শত্রুমিত্র সকলের প্রতি সংশয় কণ্টকিত। জাগ্রত চিত্তকে আহ্বান করি ; যার সংস্কারমুক্ত উদার আতিথ্যে মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীণ মুক্তি অকৃত্রিম সত্যতা লাভ করি। বীর্য এবং সৌন্দর্য, কর্মসিদ্ধমতী সাধনা এবং সৃষ্টিশক্তিমতী কল্পনা, জ্ঞানের তপস্যা এবং জনসেবার আত্মনিবেদন, এখানে নিয়ে আসুক আপন আপন বিচিত্র দান।’