সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিন অভিনেতা, গায়ক, স্বাধীনতা সংগ্রামী। এক অঙ্গে বহু সত্তা তাঁর। বিদেশে হ্যাট কোর্টে ইংলিশবাবু, দেশে আবার ধুতি পাঞ্জাবিতে মাটির মানুষ। সেই তিনিই আবার ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রথম লোকসভার সদস্য। তিনি হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। বাঙালির কাছে তাঁর পরিচিতি ফেলুদার সিধু জ্যাঠা এবং গুপি বাঘার ম্যাজিশিয়ান বরফি হিসাবে।

আসলে হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের দিদি ছিলেন সরোজিনী নাইডু, দাদা কমিউনিস্ট বিপ্লবী বীরেন চট্টোপাধ্যায়। এমন পরিবারের ছেলের রাজনীতিকে এড়িয়ে থাকা শক্ত ছিল। ১৯৫২ সালের স্বাধীন ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিজয়ওয়াড়া থেকে‚ কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হয়ে। জিতেওছিলেন বাম মতবাদে বিশ্বাসী ‘সিধু জ্যাঠা’। উত্তপ্ত বাদানুবাদ ও রাজনৈতিক তর্কে ভরপুর লোকসভায় খুশির হাওয়া ছিলেন হারীন্দ্রনাথ। প্রত্যেক দলের নেতারাই তাঁকে অত্যন্ত সম্মান এবং পছন্দ করতেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন তিনি৷ তবে সাহিত্য ও বিনোদন জগতই ছিল বাঙালির ‘গুগলের’ জীবনের মূল অঙ্গ।

উচ্চশিক্ষার জন্যে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। প্রতিভাবান হারীন্দ্রনাথ তার ‘ফিস্ট অফ ইয়ুথ’ কাব্যগ্রন্থের জন্যে গবেষনার সুযোগ পান। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। আন্দোলনের সময় তিনি হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় গীতিকার ও সংগীতশিল্পীর কাজ করেন। ‘শুরু হুই জঙ্গ হামার’ গানটি গাইবার জন্যে ৬ মাস জেল হয়। গণনাট্য ও প্রগতি লেখক সংঘের সাথে গভীর যোগাযোগ ছিল।

১৯৬২ সালে প্রথম অভিনয়‚ গুরু দত্ত-এর সাহেব বিবি গোলামে। আশীর্বাদ ছবিতে ডুয়েট গেয়েছেন অশোক কুমারের সঙ্গে | হৃষীকেশ মুখ্যই যখন তপন সিনার গল্প হলেও সত্যি-র হিন্দি ভার্সন ‘বাড়ছি‘ ছবিতে অভিনয় করেন। বাড়ির বৃদ্ধ কর্তার ভূমিকায় হারীন্দ্রনাথ ছাড়া কাউকে ভাবতে পারেননি পরিচালক। এত কিছু বলার পরেও হারীন্দ্রনাথের কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায় ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এ জাদুকর বরফি এবং‚ ‘সোনার কেল্লা’য় সিধু জ্যাঠা , ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে স্যার বরেন রায়-এর নাম উল্লেখ না করলে । বাঙালির মনের ক্যানভাসে তাঁর এই তিন রূপই স্থায়ী রঙে আঁকা রয়েছে।

বাঙালির ‘বরফির’ লেখা সনেট মন জয় করেছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। হিন্দিতে শিশুদের জন্য পদ্যও লিখেছিলেন। তবে ইংরেজিতেই তাঁর কবিতা বেশি খ্যাত ছিল। হারীন্দ্রনাথের প্রথম কবিতাগুচ্ছ ‘ The Feast of Youth ‘ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৮ সালে। লন্ডনে ফিৎজউইলিয়াম কলেজের রিসার্চ স্কলার হারীন্দ্রনাথের গবেষণার বিষয় ছিল কবি উইলিয়াম ব্লেক ও তাঁর কবিতা। সে সময় ইন্ডিয়ান ম্যাগাজিন‚ ব্রিটেন অ্যান্ড ইন্ডিয়া-সহ বেশ কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কবিতা । হারীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি ‘দ্য ম্যাজিক ট্রি‚ ‘অ্যানশিয়েন্ট উইংস’, ‘ব্লাড অফ স্টোনস’, ‘স্প্রিং ইন উইন্টার’ , ‘ভার্জিন অ্যান্ড ভাইনইয়ার্ড, ‘নুন’, ‘শেপার শেপড’ । সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছিল৩ন নাট্যকার হিসেবেও । উল্লেখযোগ্য নাটক ‘তুকারাম, ‘আবু হাসান’ এবং ‘সিদ্ধার্থ-দ্য ম্যান অফ পিস’ ।

‘জুলি’ ছবির বিখ্যাত ‘মাই হার্ট ইজ বিটিং‘ গানটি তাঁরই লেখা। ১৯৬৬ সালে নিজের লেখ গান ‘ রেল গাড়ি’ নিজেই গেয়েছিলেন আকাশবাণীতে। গানটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে হৃষীকেশ মুখার্জি এবং অশোককুমার সেটি ব্যবহার করেছিলেন ‘ আশীর্বাদ‘-ছবিতে। ১৯৭৩ সালে পদ্মভূষণে সম্মানিত হন হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। ১৯৯০-এর ২৩ জুন, ইন্টারনেট যুগ শুরু হওয়ার আগেই ৯২ বছর বয়সে বিদায় নেন বাঙালির গুগল‚ সিধু জ্যাঠা’।