দেবময় ঘোষ: দূর্গা পুজোর গন্ধ এসেছে। আশ্বিন মাসে শুক্লা ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর বোধন হবে। বোধন হলো শারদীয় দুর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জেনে রাখা প্রয়োজন, এই বোধনকে বলা হয় অকাল বোধন।

প্রথমেই আমাদের জানতে হবে, বোধন কী? পুজোয় বোধনের গুরুত্ব কোথায়? এবং আশ্বিন মাসের দূর্গা পুজোকে কেন অকাল বোধন বলা হয়।

বোধন অর্থাৎ জাগরণ। নিদ্রিত বা ঘুমন্ত দেবীকে পুজোর জন্য ঘুম থেকে জাগানোই হলো বোধন। স্বাভাবিক ভাবেই অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, মা দূর্গা ‘চৈতন্যময়ী মা।’ তিনি আবার কিরূপে নিদ্রিত থাকবেন? বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, মাতৃবিগ্রহে বা মায়ের মৃন্ময়ী রূপে বা মাটির মাতৃপ্রতিমায় তাঁর যথার্থ স্বরূপের উদ্বোধন করার চেষ্টা করতে হয়। বেলুড় মাঠের স্বামী প্রমেয়ানন্দ মহারাজ তাঁর ‘পূজা-বিজ্ঞান’ বইটিতে ‘পূজাতত্ত্ব’ বই এর ৬৬-৬৭ পৃষ্ঠা উদ্ধৃত করে লিখেছেন, “আমাদের যখন যে বস্তুর বা গুণের অভাব বোধ হয়, পূর্ণস্বরূপা চৈতন্যময়ী মায়ে তখন সে বস্তু বা গুণের অভাব কল্পনা করিয়া আরোপের সাহায্যে তাঁহার যথার্থস্বরূপের উদ্বোধন করিবার প্রয়াস পাইতে হয়।”

অকাল বোধন বিষয়টি খুবই আকর্ষণীয়। রাবণ বধের জন্য ভগবান শ্রীরামচন্দ্র দেবীর কৃপা লাভ করার জন্যই শরৎকালে দেবীর পুজো করেছিলেন। সেই তখন থেকেই তাই শারদ উৎসব।

বোধন বা জাগরণের অন্য একটি তত্বও রয়েছে। পূরণে কথিত, আমাদের ৬-মাসে দেবতাদের একদিন এবং বাকি ৬-মাস একরাত। মেঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ৬-মাসকে বলে উত্তরায়ণ এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ পর্যন্ত ৬-মাসকে বলে দক্ষিণায়ান। উত্তরায়ণ-এর সময় দেবতারা জাগ্রত থাকেন। দক্ষিণায়নের সময় ঘুমন্ত। শরৎকাল বা শারদ উৎসব পড়ে দক্ষিণায়নে। দেবতারা ঘুমন্ত। পুজোর প্রথম কাজ তাঁদের জাগাতে হবে। সেই কারণেই রামচন্দ্র দেবীর বোধন করেছিলেন।

এবার প্রশ্ন, কেন ‘অকাল’ এই বোধন? বিভিন্ন বোধনের মন্ত্রে রাবণ বধের জন্য রামচন্দ্রকে কৃপাদানের জন্য ব্রহ্মার অকাল বোধনের উল্লেখ রয়েছে। দেবীকে অসময়ে জাগিয়ে পুজো করতে হয়েছিল বলে শরৎকালের এই বোধনকে অকাল বোধন বা অকাল পুজো বলা হয়।

প্রসঙ্গত, জেনে রাখা প্রয়োজন, রাজা সুরথ চৈত্র মাসে শুক্লা অষ্টমী ও নবমী তিথিতে শাস্ত্রবিধি মেনে দূর্গা পুজো করেছিলেন। সেসময় বসন্তকাল। তা উত্তরায়ণ-এর মধ্যেই পড়ে। দেবতারা সেসময় জেগেই থাকেন। ও পুজো বাসন্তী ওয়াজ নামে পরিচিত হয়। সে পুজোয় বোধনের দরকার হয় না। কিন্তু, রাবণ বধ করবে রামচন্দ্র যেহেতু শরৎকালে অকাল পুজো করেছিলেন, সেই কারণে তাঁর পুজোকে অকাল বোধন বলা হয়। তবে কালক্রমে এই পুজোয় বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে। দেবী ভগবত এবং কালিকা পুরাণে এই পুজোর বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়।