লন্ডন: এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘ঘোস্ট টাউন’ বলা হচ্ছে। দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চিত্রটা একেবারে সামনে চলে এসেছে। গোটা দেশে অধিকাংশ হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর। এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল পরিচালক NHS (ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস) ডাক্তার আর নার্সের সংকুলানে ভুগছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে লন্ডন থেকে লিখলেন সায়ন্তন দাস অধিকারী, ডিরেক্টর, ক্যান্ডিড কমিউনিকেশন (ইউ কে)।

মহামারী শব্দটা ছোটবেলা থেকে ইতিহাসের বইয়েই পড়েছিলাম। চাক্ষুস সেটা জীবদ্দশায় দেখে যাবো, তাও আবার খোদ এই লন্ডন শহরে বসে, এটা পুরো সিলেবাসের বাইরে ছিল।

তিন বছর আগে কলকাতা ছেড়ে স্থায়ী ভাবে লন্ডনে আসার আগে এটাই জানতাম যে ব্রিটেনের মতো প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে চিকিৎসা ব্যবস্থা এতটাই উন্নত যে এরা কাউকে মরতে দেয়না। মৃত্যুর মুখ থেকেও বাঁচিয়ে আনে। এই করোনার প্রকোপ না দেখা দিলে আমার এই ধারণাটা হয়তো বদলাতো না। ঘটনা এটাই যে, ইউরোপ এই ভাইরাসটাকে আদপে পাত্তা দেয়নি। এখন সেটার মাশুল দিতে হচ্ছে।

ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রোজকার এই করোনা মোকাবিলার ধরণ দেখে সত্যি মনে হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মপদ্ধতি এদের কাছে তুলে ধরার যদি কোনও নূন্যতম উপায় থাকতো। রাতারাতি একটা স্টেডিয়ামকে হাসপাতালে বদলে ফেলা বা আস্ত একটা সরকারি হাসপাতালকে শুধুমাত্র করোনার জন্য নিয়োজিত করা কিংবা নিজের সংক্রমণ হওয়ার ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে সব জায়গায় সরেজমিনে তদারকি করা এবং এখানেই শেষ নয়…সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত আশ্বস্ত করা… তাঁদের সাহস জোগানো।

পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে গিয়ে বলছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কর্মকান্ডের কানাকড়িও যদি এ দেশের সরকার একটু আগে থেকে করতে পারতো তাহলে এতো প্রাণহানি দেখার দুর্ভাগ্য হয়তো হতো না। সাধারণ মানুষ ছেড়ে দিন, যুবরাজ চার্লস-এরও করোনা ধরা পড়েছে। করোনায় আক্রান্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু রাজপ্রাসাদের অলিন্দেও এই ভাইরাস থাবা বসাতে পারে এটাও বোধহয় ব্রিটেন বাসীর কাছে স্বপ্নাতীত ছিল।

আমি থাকি পূর্ব লন্ডনের রেইনহ্যাম নামের একটা জায়গায়। আমার ফ্ল্যাটটা রেইনহ্যাম রোডের উপরেই। ঘরবন্দি হয়ে আছি গত সপ্তাহ থেকেই। জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকালে মনে হয় কোনও মৃত্যুপুরীতে আছি। যে কোনও ‘হরর’ ছবির শ্যুটিং করার আদর্শ লোকেশন। পুরো শুনশান। রাস্তায় মানুষ দেখতে পাওয়াটা মরুভূমিতে মরুদ্যান খুঁজে পাওয়ার মতো। এই অবস্থায় দুদিন গিয়েছিলাম সুপার মার্কেটে। এখানে বড় সুপার মার্কেট বলতে Asda, টেস্কো ইত্যাদি ব্র্যান্ড গুলোতে সবাই যায়। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না চাল, আটা, চিকেন।

কাউন্টারে জিজ্ঞেস করতে জানতে পারলাম আসার সঙ্গে সঙ্গে সেটা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এশিয়ান দোকান গুলোর অবস্থা আরও খারাপ। যেগুলোর মালিকানা ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের হাতে সেখানে বাংলা ভাষায় কালোবাজারি চলছে। একটা বেবি চিকেন, যেটার দাম ৪ থেকে ৫ পাউন্ডের মধ্যে, সেটা বিক্রি হয়েছে ১৯ পাউন্ডে। দিনে ডাকাতিটাও এখানে এসে দেখতে হবে সেটারও ধারণা ছিল না।

লন্ডনকে এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘ঘোস্ট টাউন’ বলা হচ্ছে। দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চিত্রটা একেবারে সামনে চলে এসেছে। গোটা দেশে অধিকাংশ হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর। এখানকার স্বাস্হ্য ব্যবস্থার মূল পরিচালক NHS (ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস) ডাক্তার আর নার্সের সংকুলানে ভুগছে।

গতকালও ‘চ্যানেল এস’, ব্রিটেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলাদেশী চ্যানেলে দেখলাম পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের রয়েল লন্ডন হাসপাতালে কম বয়সী এক ব্রিটিশ বাংলাদেশী এই ভাইরাসে মারা গিয়েছেন। মাত্র ২১ বছরের একটি মেয়েরও মৃত্যু হয়েছে গতকাল। এক অবস্থা বার্মিংহ্যাম, ম্যানচেস্টার, লিভারপুল, লীডস-এর মতো শহরগুলোতে।

একটাই ভরসা, লকডাউনটা আক্ষরিক অর্থে এখানে সবাই খুব মেনে চলছেন। শিক্ষিত দেশতো। কিন্তু এর মধ্যেও লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড খোলা, রাস্তায় বাসও চলছে। চলছে দূরপাল্লার ট্রেনও। এটা কি ধরনের লকডাউন বুঝলাম না। ভারতের মতো ১৩০ কোটি দেশে যদি প্লেন, ট্রেন, বাস, ট্যাক্সি বন্ধ করে দেওয়া যায় তো ব্রিটেনে কেন সম্ভব না। এর উত্তর তো আমার কাছে নেই। ব্রিটিশ সরকারের বিশ্বাস ১২ সপ্তাহের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো হবে। আশা নিয়েই তো এখন থাকতে হবে। এ ছাড়া তো কোনও উপায় নেই।