অনন্যা তেওয়ারি, লিখলেন আমেরিকা থেকে: বাড়িতে হই হই করা একখানা ব্যাপার দিয়ে শুরু । বাড়ি বলতে প্রবাস বাসের কথা বলছি। সুদূর আমেরিকা তে বসে করোনা ভাইরাসের নির্বিরোধ জয়োল্লাস দেখছি। বেটার হাফ এর আগামী একমাস বাড়িতে বসে কাজ। খবর হওয়া মাত্রই বাড়ি এবং পাশের বাড়ি দুই কর্তাদের একপ্রকার ছুটির মেজাজ শুরু হয়ে গেছিলো। আমি অভাগী এপোক্যালিপ্টিক আবহাওয়াতেও নাকে মুখে গুঁজে অফিস ছুটছিলাম এমন সময় আমারও ঘণ্টা বেজে গেলো এবং কম্পিউটারসহ তল্পিতল্পা গুটিয়ে আমাকে মাস দেড়েকের জন্যে গৃহবন্দি জীবন সমেত অফিস কাছারি বুঝিয়ে দেওয়া হলো।

মাস দেড়েক কথাটা একটা পোষাকি সময়। ঝেড়ে কাশলে সময় এর গন্ডি কাটা বড়োই কঠিন। সে দুঃখের কথা তাকে তুলে রেখে এখন গল্পে আসি। এ গল্প কিন্তু গল্প না বা এ গল্প, গল্প হলেও সত্যি। চারিদিকে যখন করোনা এই গেলো এই গেলো রব তুলে রেখেছে তখনই চিনের বিদেশমন্ত্রকের জনৈক প্রতিনিধি বলে এ করোনা আমেরিকারই দান। বোঝো ঠেলা। এসব চমকপ্রদ খবর পড়তে পড়তে চোখটা মাঝেমাঝেই ছানাবড়া হয়ে যাচ্ছে। তবে ছানাবড়া হওয়ার কিন্তু আরো কারণ আছে। এমনিতেই করোনা ভাইরাস এখন বিশ্বের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যদের চোখ রাঙানির অনুমান।

সেরকম একটা ঘটনায় আসি। ১৯৮১ সাল ডিন কুন্টজ এর লেখা একটি থ্রিলার উপন্যাস “ইন দ আইস অফ ডার্কনেস”। তাতে লেখা ২০২০ সালে উহান ৪০০ নামের একটি ভাইরাস এ বিশ্বব্যাপী প্রাণহানির গল্প। এমন অনেক কথাই আছে যা হুবহু মিলে যায়। গল্পের গরু গাছে উঠতে পারে। কিন্তু তাবলে মগডালে? এই আকস্মিক সংযোগে কপালের মাঝে ভাঁজ পড়ে বই কি। যাই হোক এটাকে কাকতালীয় ছন্দে ফুৎকারে উড়িয়ে দিলাম। এসবের মাঝে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ঘোষণায় ট্রাম্পের সমর্থনের পারদ বেশ তরতরিয়ে চড়ছে।

মাঝখান থেকে বুড়ো মানুষগুলো একটু প্রাণ খোয়াচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতি বেশ ফুলেফেঁপে ঢোল। ইরান কবর খুঁড়ছে। দেশের পর দেশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে। আর মাঝখান থেকে রোজগার বাড়ছে অনলাইন সংস্থা গুলির। হাওয়া হয়ে গেছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের স্টক। এমন কি পশ্চাৎদেশ পরিষ্কারের কাগজগুলো ও পর্যন্ত লোকজন স্টক করে রাখছে। ভাগ্যিস আমার দেশ ভারতবর্ষ। কাগজ ছাড়া বাঁচতে জানি।

উফফ হাইজিনের পরাকাষ্ঠা হয়ে বেঁচে থাকা যদিও কষ্টের তবুও প্রাণের দায়ে লোকে সেটাও করছে।আমি তবে দিব্য আছি। এ দেশ খারাপ কিছু রাখেনি। শুধু নিত্যদিনের জিনিসের জোগানে হয়তো এবার একটু কম পড়বে। তবে সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে আস্তে আস্তে মন্দার দিকে এগোচ্ছে সে কথা আলাদা করে বলা টাই বাহুল্য। ২০০৮ সাল মনে পড়ে ? একযুগ পরে আমরা তার ই দোর গোড়ায় এসে হয়তো দাঁড়াচ্ছি। আজকে বুঝতে না পারলেও একটু সজাগ চোখে তাকিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন তেলের দাম , শেয়ার মার্কেট।

সবই পড়ন্ত। কানের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে প্রথম বিশ্বের ভোট যুদ্ধের দামামা। কিন্তু সে সব কিছু মিছে করে বিশ্ব দরবারে এখন একজন এরই একচেটিয়া রাজত্ব। সব ভোটে জয়ী। আতঙ্কের করোনা। এবার আসি করোনা বিধ্বস্ত দেশ আমেরিকার কথায়। সমস্ত পৃথিবীতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১২ লক্ষ পেরিয়ে ১৩ ছুঁই ছুঁই। আর এই মুহূর্তে যে আক্রান্তের সংখ্যায় সবাই কে পিছে ফেলে শীর্ষ স্থানের দাবীদার সে আর কেও না, প্রথম বিশ্বের এই বিগ ফ্যাট দেশ আমেরিকা। এবার আরেকটা চমকপ্রদ ঘটনা হলো আক্রান্তের সংখ্যা এদেশে যাই হোক সব সময় তার সাথে ১ যোগ করে পড়বেন।

এবং এই ১ যোগের কারণ হলো একটি বাঘ। কি ভাবে? আজ্ঞে হ্যাঁ নিউ ইয়র্ক এর ব্রনক্স জু এর হতভাগা এক খানা বাঘ, মানুষ নামের সামাজিক পশু থেকে রোগখানা বাধিয়ে ফেলেছে। আমরা নিজেদের দেশের লোকদের হুজুগ জনিত কাজগুলো কে নিয়ে ফেসবুক হোয়াটস্যাপ এ সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিই। কিন্তু বিশ্বাস করুন এটা দেশজনিত মানসিকতা নয়। Its human kind. অর্থাৎ মানুষ মাত্রই তাই। এখানেও লোকজন locked down situation টা কে অনির্দিষ্ট কালের “হলি”ডে মনে করে বিচ তোয়ালে নিয়ে বিচে দৌড়াচ্ছে sunbath নিতে। প্রসঙ্গত বলি এখন ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত এখানে লকড ডাউন।

মাঝখানে একদিন সবজি কিনতে গিয়ে দেখলাম সুপারমার্কেট এ ১০০ জনের বেশি লোক ঢুকতে দিচ্ছেনা এবং ঢোকার লাইন এ ছ ফুটের দূরত্বে দাঁড়ানোর জন্যে দাগ কাটা। নিউইয়র্ক এর মেডিকেল স্কুলগুলো তে early graduation দিয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে medical workforce এ যোগ দিতে পারে। নিজের দেশে মেডিকেল স্টাফদের রেইনকোট দেওয়া হয়েছে শুনেছি। কিন্তু এদেশ এর মেডিকেল স্টাফরাও যে বিশাল ভালো আছে সে খবর পাইনা। newyork আক্রান্তদের প্রত্যেক পাঁচ জনের এক জন মেডিক্যাল professional. Medical equipments এতটাই কম ছিল যে তারা মাস্ক, গ্লাভস দিনের পর দিন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ব্যবহার করেছে । এবং খতিয়ান গুনেছে প্রাণ দিয়ে। তারপর শুনলাম রাশিয়া থেকে medical equipments ভর্তি এক হাওয়াই জাহাজ এর সাহায্য এসেছে।

আমার থাকার রাজ্য Illinois. শহরটা Bloomington, কাছের বড় সহর শিকাগো। Illinois এর আক্রান্ত দের একটা বড়ো অংশ শিকাগো অঞ্চল গত কুক কাউন্টি থেকে। বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা ১১০০০ পেরিয়ে গেছে। গত একমাস ধরে বাড়িতে ফোন করলে বা বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে কথা বললে একটাই প্রসঙ্গ। কি রে ঠিক আছিস তো? স্বস্তির খবর এখনও ঠিক আছি। কিন্তু কতদিন থাকবো জানিনা। ক্যালিফোর্নিয়া তে chemistry তে ডক্টরেট করতে আসা বন্ধুর বোনের সাথে কথা হচ্ছিল। আলোচনা ক্রমে জানলাম ৩০ রকম ওষুধের খোঁজ মিলেছে কিন্তু প্রয়োগের নিরিখে মানব দেহে পরীক্ষার পরিণীতি এখনও সময় সাপেক্ষ।

এই মুহূর্তে আমেরিকায় বসে করোনা র চূড়ান্ত সপ্তাহ গুলো অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ভরে রাখা ছাড়া কোনো গতি নেই। সাথে ওই অমোঘ ভ্যাক্সিন এর অপেক্ষা। আরেকটা কথা একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও আমি সবাই কে বলতে চাই। বিদেশ থেকে আসা মানেই যে করোনা আক্রান্ত সেরকম কিন্তু না। অসুবিধা হলো যখন তুমি জানো তুমি অসুস্থ তবুও আসছো সেটা। এমনকি অসুস্থ হয়ে ফেরাটাও অসুবিধা না।কিন্তু ফিরে প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে না চলে ভাইরাস ছড়ানোর অনুঘটক হলেই মুস্কিল।

শুধুমাত্র ১৪ দিনের একা থাকার ভয়টাই সেখানে সব কর্তব্যের উর্ধে উঠে যাচ্ছে। চিন কে ভাইরাস এর জন্যে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। Problem আসলে সে সব মানুষরা যারা জানে এটা করোনা এবং তারা আক্রান্ত তবুও ঘুরে বেড়াচ্ছে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে এবং সেসব মানুষরা যারা করোনা যেকোনো সময় হতে পারে জেনেও ঘুরে বেড়াচ্ছে। It’s the human kind। অর্থাৎ আমরা সমষ্টিগত ভাবে মানবজাতি যারা সবসময়ই ভুলে যাই যে সেরে ওঠার থেকে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই শ্রেয়।