দেবময় ঘোষ, কলকাতা: নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ১২ দফা দাবি রয়েছে৷ শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র-যুব, কৃষকদের ফসলের দাম, আট হাজার টাকা ন্যুনতম বেতন, শ্রমিকদের ৬ হাজার টাকা পেনশন নিশ্চিত করা, শ্রমিক বিরোধী আইন এবং কৃষক আত্মহত্যার বিরুদ্ধে ধর্মঘট মঙ্গল এবং বুধবার সারা ভারতে ৪৮ ঘন্টার ধর্মগটের ডাক দিয়েছে ১০টি ট্রেড ইউনিয়ন৷ সারা দেশের বামপন্থীরা মোদী সরকারকে কৃষক লং-মার্চের মাধ্যমে লালঝান্ডার ক্ষমতা দেখিয়ে ছিলেন৷ এই ধর্মঘটকে সফল করে মোদী সরকারের দুশ্চিন্তা দীর্ঘায়িত করতে চলেছে দেশের বাম শক্তি৷ সিপিএমের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সিআইটিইউ (সিটু)-এর সর্বভারতীয় সহ সভাপতি শ্যামল চক্রবর্তী কেন্দ্র রাজ্যের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন৷

বিজেপি নয় তৃণমূলই আক্রমণ করবে

বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ধর্মঘটের বিরোধীতা বাস্তবিক৷ কিন্তু কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলিতে বনধের কী রকম প্রভাব পড়বে? প্রশ্নের উত্তরে শ্যামল জানান, বিজেপি শাসিত রাজ্যে পরিকল্পনামাফিক আক্রমণ করে ধর্মঘটের বিরোধীতা করা হবে না বলেই খবর রয়েছে৷ ধর্মঘটীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাবে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গ সরকার৷ কংগ্রেস শাসিত রাজ্যে ধর্মঘট ভালো হবে৷ আমাদের পাশের রাজ্যে ওড়িশা – যেখানে বিজু জনতা দল (বিজেডি) ক্ষমতায় রয়েছে – সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পটনায়কের সঙ্গে দেখা করেছিলেন ধর্মঘটীদের প্রতিনিধিরা৷ তিনি বলে দিয়েছেন – তাঁরা ধর্মঘটকে সমর্থন করবেন৷ সারা ভারতেই চিত্রটা ভিন্ন হবে৷ আগামী ৪৮ ঘন্টায় মোদী সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হবে৷

মমতা আটকাবে, আমরাও জমি ছাড়ব না

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সারা দেশেই বিজেপি বিরোধী অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন৷ তিনি মোদী সরকারের বিরোধী হলেও রাজ্যে ধর্মঘটের বিরোধীতা করবেন৷ মমতার বিরোধীতাই পশ্চিমবঙ্গে ধর্মঘট পালনের প্রধান বাধা? শ্যামলের বক্তব্য, ‘‘ওটা তো জানা কথা যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মঘটের বিরোধীতা করবেন৷ তা জেনেই মঙ্গল এবং বুধবার রাস্তায় নামবে ধর্মঘটীরা৷ এক ইঞ্চিও জমী ছাড়বে না৷
সর্বশক্তি দিয়ে তাঁরা ধর্মঘটকে সফল করবেন৷’’

যাত্রা দলের ভীম আর দূর্যধন, গ্রিনরুমের পিছনে ‘একগ্লাসের’ বন্ধু

তৃণমূল কংগ্রেস যদি ধর্মঘটকে সমর্থন করত তবে কী ১৯ জানুয়ারি মমতার ‘মোদী বিরোধী’ব্রিগেডের মঞ্চে বামফ্রন্টেও দেখা যেত? শ্যামল চক্রবর্তীর জবাব, ‘‘ওটাতো একটা সাধারণ প্রশ্ন-উত্তর৷ ওটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার দরকার নেই৷ আসল কথা, মমতা এবং বিজেপি যাত্রা দলের ভীম আর দূর্যধনের মতো৷ মঞ্চে অভিনয় করছে৷ ভীম দূর্যধনের হাঁটু ভাঙছে৷ যদি ‘গ্রিনরুমে’ একটু উঁকি মেরে দেখেন, তবে দেখবেন দুজনেই ‘একগ্লাসের’ বন্ধু৷

বিরুষ্কা ও বিজেমূল

রবীন্দ্র কাব্য উদ্ধৃত করে শ্যামল বলেন, ‘‘শুধুই মুখের কথা শুনেছো দেবতা৷ শোননি কী জননীর অন্তরের কথা…৷’’মমতার অন্তরের কথা হল এই যে তিনি বিজেপিকে ছাড়বেন না৷ এখন মানুষ বুঝে গিয়েছে৷’’ ‘‘বিরাট কোহলি এবং অনুষ্কা শর্মাকে লোকে একত্রে বলে ‘বিরুষ্কা৷’ তেমনই বিজেপি এবং তৃণমূলকে লোকে একসঙ্গে ‘বিজেমূল’বলছে৷ ট্রামে-বাসেও এখন এই আলোচনা হচ্ছে৷ ময়লা খালের জলের সঙ্গে নর্দমার জল মিশে গেলে যে দূষিত আবহাওয়া তৈরি হয় – পশ্চিমঙ্গের আবহাওয়াও সেই রকমই দূষিত৷’’

ফাইল ছবি৷

অটলবিহারিকে মালপোয়া খাওয়ালো কে?

শ্যামলের বক্তব্য, ‘‘মমতা বনধের বিরোধীতা করছে৷ বিজেপি সেক্ষেত্রে বলছে মমতার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ আছে৷ মমতা ফেডারেল ফ্রন্ট করছেন৷ এই ফেডারেল ফ্রন্ট বিজেপির দ্বিতীয় বিকল্প৷ প্রথম বিকল্প হল, বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে মোদী বা বিজেপির অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হবেন৷ এখন তো নিতিন গড়করির নামও শুনছি৷ দ্বিতীয় বিকল্প, একজন শিখন্ডি খাড়া কর৷ সেই শিখন্ডি হলেন মমতা৷ কারণ মমতা বিজেপির সঙ্গে ছিল৷ সেই সব থেকে নির্ভরযোগ্য৷ ও বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে হাত ধরে নিয়ে এসেছে৷ সে-ই অটলবিহারি বাজপেয়ীকে মোলপোয়া খাওয়ায়৷ মোদী জিতলে ফুল পাঠায়৷ সুতরাং তৃণমূল বিজেপির ‘মক ফাইট’চলছে৷

ফেডারেল ফ্রন্ট না দরকষাকষির জায়গা?

রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ কেন মমতাকে প্রধানমন্ত্রীত্বের পথে এক নম্বর বাঙালী বলছেন? শ্যামলের জবাব, ‘‘তাইতো বলছি৷ ফেডারেল ফ্রন্ট মমতা করেছেন একটাই উদ্দেশ্যে, ওটাই হবে বিজেপি এবং কংগ্রেসের সঙ্গে তার ‘বারগেইনিং পয়েন্ট বা দরকষাকষির জায়গা৷ বিজেপি ‘কনসেশন’ দিলে ওখানে যাবেন নয়তো কংগ্রেস  ‘কনসেশন’ দিলে সেখানে যাবেন৷ বিজেপি বিরোধী ঐক্যকে ভেঙে দিতে মমতা ‘পঞ্চম বাহিনীর’ কাজ করে যাচ্ছেন৷ একান্ত অনুগতভাবে করছেন৷

পিপলি লাইভ

কৃষক-লং মার্চ হওয়ার পর ভারতে ‘কৃষকবন্ধু’ সরকার বা রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেশ বেড়েছে৷ শ্রমিক-কৃষক স্বার্থে এই বনধ বামেদের কতটা ডিভিডেন্ট দেবে? শ্যামলের জবাব, ‘‘বিজেপির অ্যাজেন্ডা ছিল, রামমন্দির, ধর্ম এবং গরু৷ তারবিপরীতে মমতার অন্য একটি সম্প্রদায়ের ‘মুখিয়া’ হিসেবে কাজ করছিলেন৷ ২০০ কৃষক সংগঠন মিছিল করেছে৷ ওদের ভোটের অ্যাজেন্ডাও বদলে গিয়েছে৷ কাল যে (জামুরিয়ায়) কৃষক আত্মহত্যা হল, সংখ্যাটা এরাজ্যে ২০০ তে দাড়িয়েছে৷ মমতা কোনও দিনও স্বীকার করেন নি৷ এই কৃষকবন্ধু প্রকল্পে এক একর জমি থাকলে মমতা ৫ হাজার টাকা দেবেন৷ প্রথমত, ১ একর জমি পশ্চিমবাংলায় কতজন চাষির রয়েছে৷ শতকরা ৮৪ভাগ চাষি অল্প জমির মালিক৷ কৃষক মরলে টাকা পাবে৷ ওই যেন আমির খানের ‘পিপলি লাইভ’ সিনেমা৷ সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷ আমির অনেক ‘ম্যাচিওর্ড’৷ অনেক আগেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সিনেমা বানিয়েছিলেন হয়তো৷’’

৩ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেড ছোট মনে হবে

শ্যামলের বক্তব্য, ‘‘৩ ফেব্রুয়ারি যা জমায়েত হবে, মনে হবে ব্রিগেডের থেকেও বড় মাঠ হলে ভালো হতো৷ জমায়েতের কাছে ব্রিগেডও ছোট মনে হবে৷ ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে ওরা (তৃণমূল কংগ্রেস) যে মিটিং (২১ জুলাই সভা) করে সেখানে বলে নাকি ১৫-১৬ লক্ষ লোক হয়৷ মানুষ পাগল নাকি৷ যারা মাপতে পারে তারা এমন কথা বলে না৷ ওখানে শুব বেশি হলেও এরাস্তা -সে রাস্তা মিলিয়ে ১ থেকে দেড় লক্ষ লোক থাকতে পারে৷ তবে দেখে নেবেন, ৩ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডের মাঠও ছোট হয়ে যাবে৷’’