স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার পথে সিপিএম বাংলার মানুষের সঙ্গে অমানুষিক এবং অগণতান্ত্রিক আচরণ করেনি৷ ক্ষমতার শেষলগ্নে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চরম অগণতান্ত্রিক এবং অসংলগ্ন আচরণ করছেন – মনে করে বিজেপি৷ বিজেপির মনে হয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা ছাড়া সিপিএমের আর কোনও নীতি নেই৷ সম্প্রতি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা রায়গঞ্জের সাংসদ দেবশ্রী চৌধুরি সরাসরি জানিয়েছেন, ‘‘সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের সময় রাজ্যে কমিউনিস্ট সরকার ছিল৷ সিপিএমের সরকার ছিল, মুখ্যমন্ত্রী ছিল বামফ্রন্টের৷ তারা তো এই আচরণ করেনি৷

সরকার পরিবর্তনের জায়গায়, মানুষ তার রায় নিয়ে আসছেন৷ মানুষ তাদের রায় জানাচ্ছেন, তাদের পছন্দ জানাচ্ছেন৷ সেই মুহূর্তে এটা করা যায়? অতীতের কোনও মুখ্যমন্ত্রী কোনও পরিবর্তনের আগে এই কাজ করেছেন?এই আচরণ শোভাদায়ক নয়৷ সংবিধানের সমস্ত মর্যাদাকে লঙ্ঘন করছে৷’’ তবে দেবশ্রী শুধু একাই নন, রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বা প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা এর আগে অনেকবারই আইন-শৃঙ্খলার এবং গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো রক্ষার প্রশ্নে সিপিএম জমানাকে মমতা জমানার তুলনায় এগিয়ে রেখেছিলেন৷ পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল যে কালো অধ্যায় তা দ্ব্যর্থহীনভাষায় জানাতে চায় বিজেপি৷

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রচার যখন তুঙ্গে, তখন ‘জয় শ্রী রাম’ধ্বনি শুনে মেজাজ হারিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা৷ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কটাক্ষ করে বলেন, দিদি ভগবানের নাম নিলেও পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করাচ্ছেন৷ এরপর দক্ষিণবঙ্গের নির্বাচনে, বিশেষ করে হিন্দিভাষী ভোটারদের কাছে ‘জয় শ্রী রাম’বড় ইস্যুতে পরিণত হয়৷ মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণার পর একই ঘটনা ঘটে উত্তর ২৪ পরগণার ভাটপাড়াতেও৷ রবিবারই মমতা বিষয়টি নিয়ে নিজের মতামত জানিয়ে বলেছেন, বিজেপি নোংরা রাজনীতি করছে৷ তবে ততদিনে জল অনেকদূর গড়িয়েছে৷ বিজেপি নেতারা অনেকেই বলছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে বিজেপি সমর্থকদের পিছনে ছুটছেন, এ দৃশ্য বাংলার মানুষ দেখবে কল্পনাতেও ছিল না৷ ভাবতে পারেন, বিধানচন্দ্র রায়, জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এই কাণ্ড করছেন? কল্পনা করলেও আঁতকে উঠতে হয়৷ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারটির কোনও মর্যাদা রাখলেন না মমতা৷’’

লোকসভা নির্বাচনের পর রাজ্যে ব্যাপকাকারে যা রটে যায় তা হল, সিপিএমের ভোট পেয়েছে বিজেপি৷ তবে পরবর্তিকালে দেখা গিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধের একত্রিত ভাবে পদ্ম শিবিরে জমা হয়েছে৷ সেখানে কংগ্রেস, সিপিএম এমনকি তৃণমূলের ভোটও রয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে৷ কিন্তু কিন্তু বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট পেয়েছেন মমতাই৷ তৃণমূল শতাংশের হিসেবে ভোট বাড়িয়েছে৷ বিজেপির বক্তব্য, নিজের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলা প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহ্য করতে পারছেন না মমতা৷ গত আট বছরে তাঁকে রাজ্যেকেই এইভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেননি৷ জনতাও প্রকাশ্যে তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পায়নি৷ তৃণমূল নেত্রীর অগণতান্ত্রিক এবং অসংলগ্ন আচরণের এটাই একমাত্র কারণ৷

বিজেপির প্রশংসায় টলে যেতে রাজি নয় সিপিএম৷ ত্রিপুরার উদাহরণ দিয়ে সিপিএম প্রমাণ করতে চেয়েছে, সিপিএম এবং তৃণমূল মূদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ৷ সেভাবে আচরণগত পার্থক্য নেই৷ সিপিএমের বিধয়ক তন্ময় ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘‘দিলীপবাবু, রাহুলবাবুকে আমি ত্রিপুরার কথা মনে করিয়ে দিতে চাইছি৷ ত্রিপুরায় ক্ষমতায় এসে বিজেপি এতদিন পর্যন্ত বিরোধীদের উপর যা যা করেছে তা নিশ্চয় ওরা জানেন৷ ত্রিপুরায় আজ গণতন্ত্র কোন পর্যায়ে তা ওই রাজ্যের পঞ্চায়েত এবং লোকসভা নির্বাচনের সময় বোঝা গিয়েছে৷ তবে একথা ঠিক, বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর আচরণ দৃষ্টিকটু৷ তৃণমূলের একমাত্র লক্ষ হল ক্ষমতায় টিকে থাকা৷ তার জন্য ওরা যা খুশি তাই করতে চেষ্টা করছে৷ ’’ তন্ময়ের মতে, সারা বিশ্বেই দক্ষিণপন্থী উগ্রশক্তির জাগরণের মাধেই উদারপন্থার বিকাশ ঘটেছে৷ বাংলাতেও অন্যথা হবে না৷

রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায়ের সাফ কথা, জয়শ্রীরাম নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর অসুবিধা নেই৷ তা তিনি জানিয়েছেন৷ কিন্তু ওই স্লোগানের আগে পরে যে গালাগাল দেওয়া হচ্ছে তা কেউ শুনেছে? ওই গালাগালের বিরুদ্ধেই মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন৷ বিজেপি রাজ্যের কোনও রায় পায়নি৷ রাজ্যের মানুষ কেন্দ্রের রায় দিয়েছে৷ জয়শ্রীরাম নিয়ে রাজনীতি করে রাজ্যে সরকারে আসা যাবে না৷ মানুষ ওতো বোকা নয়৷