প্রতীকি ছবি

দেবযানী সরকার: কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাসে লাহা পরিবার আলাদা জায়গা করে নিয়েছে৷ পরিবারের ইতিহাস বলছে, প্রায় ২৩০ বছরের পুরনো এই পুজো৷ অবশ্য পুজোর বয়স নিয়ে মতভেদ আছে পরিবারের অন্দরেই৷

নবকৃষ্ণ লাহা না দুর্গাচরণ লাহা, কে এই পুজোর প্রবর্তক তা নিয়েও বিস্তর বিতর্ক আছে লাহা পরিবারে৷ কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে এখনও উত্তর কলকাতার দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এই পরিবার৷ যেহেতু এই পরিবারে দুর্গাপুজো হয় তাই এই বাড়িতে আর কোনও মূর্তি পুজো হয় না৷

লাহা বাড়ির পুজোর রীতি-রেওয়াজ বৈচিত্রে ভরা৷ যেমন, সোজা কিংবা উল্টো রথে নয়, লাহা বাড়ির দুর্গাপুজোর কাঠামো পুজো হয় জন্মাষ্টমীর ২-৩ দিন পর৷ কাঠামোর মধ্যে একটি ছোট্ট মাটির গনেশকে পুজো করা হয়৷ পরে যখন বড় গনেশ তৈরি হয় তখন সেই ছোট্ট গনেশটা বড় গনেশের পেটের ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়৷ এই বাড়িতে দুর্গাপ্রতিমাকে প্রতীকি হিসেবে পুজো করা হয়৷ আসলে বাড়ির কুলদেবী সিংহবাহিনীর পুজো হয় ওই চারদিন৷ বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী এই পরিবার মহিষাসুর বধকে হিংস্র মনে করেন৷ তাই এখানে মা দুর্গাকে শিবের কোলে দেখা যায়৷ লাহা পরিবারে দেবী দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে নন, জগজ্জননী হিসেবে পুজিত হন৷ প্রথম থেকে একচালার প্রতিমাই পুজো হয় এই পরিবারে৷

ষষ্ঠীতে বোধনের সময় পরিবারের কুলদেবী সিংহবাহিনীকে রূপোর সিংহাসনে বসিয়ে পুজো করা হয়৷ এদের পুজোতে কোনও পশুবলি দেওয়া হয় না৷ বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী হওয়ায় এই পরিবারে ছাঁচিকুমড়ো ও শশা বলি দেওয়া হয়৷ এই পরিবারে দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ হল অষ্টমীর সন্ধিপুজো৷ সন্ধিপুজো যতক্ষন চলে ততক্ষণ বাড়ির মহিলারা দু-হাতে ও মাথায় মাটির সরার মধ্যে ধুনো জ্বালিয়ে বসে থাকেন৷

প্রতিমা বিসর্জনেও এই পরিবারের বিশেষ একটি রেওয়াজ আছে৷ বাড়ি থেকে দুর্গা প্রতিমা বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়৷বিসর্জ্জন দিয়ে কাঠামো না ফেরা পর্যন্ত বাড়ির দরজা বন্ধ থাকে৷

পরিবারে কথিত আছে, একবার নিরঞ্জনের উদ্দেশ্যে প্রতিমা নিয়ে বাড়ি থেকে সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির এক মহিলা দেখেন, গা ভরতি গয়না পরা একটা ছোট্ট মেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ তিনি তখন ভেবে ছিলেন, ‘মা’ হয়তো গৃহত্যাগ করলেন৷ তখন সেই মহিলা তাড়াতাড়ি গিয়ে বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেন৷ তারপর থেকেই প্রতিমা বেড়িয়ে যাওয়ার পর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেওয়ার রীতি শুরু হয়েছে৷কাঁধে করে যেহেতু মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাই নিরঞ্জনের সময় লাহা পরিবারের সদস্যরা প্রতিমা কাঁধে নেন না৷ দড়ি দিয়ে ঝালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দুর্গাপ্রতিমাকে৷