সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘বিষে বিষে বিষক্ষয়’ প্রচলিত কথাটা আল কায়েদা প্রধান খতমের পরিকল্পনার সঙ্গে মিলে যায়। আমেরিকার দুই সিআইএ এজেন্টই ছিলেন পাক বংশোদ্ভূত এবং উর্দুতে চোস্ত। তাঁদের তুখোড় নজরদারি এবং পরিকল্পনায় খতম হয়েছিল কুখ্যাত ৯/১১-র আল কায়েদার তৎকালীন প্রধান ওসামা বিন লাদেন।

‘আমরা টার্গেটে হিট করেছি। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্যে আমরা সফল হয়েছি।’ বিভিন্ন মহল থেকে যখন বালাকোটের এয়ারস্ট্রাইক নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল তখন অনেকটা এরকমই বক্তব্য রেখেছিল ভারতীয় বায়ুসেনা। এমন বক্তব্য না প্রকাশ করলেও নিখুঁত নিশানায় টার্গেট হিট করার জায়গাটি করে দিয়েছিলেন দুই পাক বংশোদ্ভূত মার্কিন যুবক। যাদের নাম কোনওদিন জানা যায়নি। তাঁদের নিশানা ছিল ওসামা বিন লাদেন এবং তাঁদের তৈরি করা টার্গেটেই সিল টিম হানা দিয়ে সফল হয়েছিল। সম্ভবত তাঁদের চেষ্টাতেই সেদিনও পালিয়েছিল পাক F-16 বিমান।

“অপারেশন ন্যাপচুন স্পিয়র” নাম দিয়ে লাদেনকে মারার জন্য টার্গেট গড়ে পাঠানো হয় ওই দুই সিআইএ এজেন্টকে। ২০১০ সাল, কিউবায় মার্কিন নৌবাহিনীর কারাগার গুয়েন্তানামো থেকে ছাড়া পাওয়া এক কয়েদিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মার্কিন সেনা জানতে পারে আল-কুয়েতি নামে এক ব্যক্তির কথা। কয়েদির দাবি ছিল, ওই আল-কুয়েতিই একমাত্র বিন লাদেনের সঠিক অবস্থানের খবর দিতে পারবে। আল-কুয়েতির খোঁজ করতে পাঠানো হয় নাম না জানা দুই সিআইএ এজেন্টকে।

কুয়েতির খোঁজ পেতে কোনও সমস্যা হয়নি দুই দক্ষ এজেন্টের। অ্যাবোটাবাদের একটি বাড়িতে ছদ্মবেশে ভাড়া থাকতে শুরু করে তারা। লক্ষ্য একটাই, যেভাবেই হোক লাদেনের অবস্থান খুঁজে বার করা। এর মাঝেই তাঁদের নজরে আসে এক রহস্যময় কম্পাউন্ড। সম্ভবত ওই কম্পাউন্ডটিতেই ওসামা লুকিয়ে থাকতে পারে এই ধারনা তাঁদের তৈরি হয়েছিল কারণ, এলাকার প্রতিবেশীদের থেকে বিভিন্ন সূত্রে তাঁরা জেনেছিলেন , ওখানে যারা বসবাস করে তারা সামজ থেকে বিছিন্ন। এলাকার কারও সঙ্গে মিশত না। মাঝে মধ্যে শুধু একটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি ভিতরে ঢুকত।

গাড়ি ঢোকার জন্য যতটুকু জায়গা দরকার মূল গেটটি ঠিক ততটুকুই খুলত।এই বাড়ির পাশে খোলা মাঠে বাচ্চারা যখন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বল ওই বাড়ির ভিতরে চলে যেত তখন তারা ভয়ে সেই বলটি ভিতরে আনতে যেত না, ভিতর থেকেও কেউ বল গুলো ফেরত দিত। এরপর তারা ফের এমন একটি বাড়ি ভাড়া নেয় যেখান থেকে লাদেনের ওই সন্দেহজনক বাড়ির প্রধান দরজা এবং ও জানলা দেখা যায়।

২০১১,এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শাকিল আফ্রিদি নামের এক ডাক্তারের টাইতে মিনি ক্যামেরা লাগিয়ে ওই বাড়ির ভিতরে পাঠানো হয়। বলা হয়েছিল শাকিল বাচ্চাদের ভ্যাকসিন দিতে এসেছেন। এদিকে দুই এজেন্ট ওই বাড়ির দিকে নজর রেখে সমস্ত আপডেট সংগ্রহ করছিলেন।

একদিন তাঁরা ওই বাড়ি থেকে ছয় মহিলাকে বেরোতে দেখে। পিছু নেন। কিন্তু ইভটিজার সন্দেহে মার খেয়ে কাজ পণ্ড হয়ে গিয়েছিল। পয়লা ২মে রাত ১টায় আরও দুই সিআইএ এজেন্ট উড়ে এসে যোগ দেয়। চারজনকে নির্দেশ দেওয়া হয় ঘরের লাইট বন্ধ করে জানলা থেকে নজর রাখতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ কম্যান্ডো বাহিনী নেভি সিল দুই পাক বংশোদ্ভূতের সন্দেহের মধ্যে থাকা বাড়িটিতে রেইড করবে।

নেভি সিলের দুটি হেলিকপ্টার বাইরে থেকে আক্রমণ করে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দুই পক্ষের গুলির লড়াই। হঠাৎ এমন গোলাগুলির শব্দে এলাকায় ভিড় জমতে শুরু করে। অপারেশনে নামে সেই দুই চর। তারা এলাকার মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তান সরকারের অপারেশন চলছে।এদিকে স্থানীয় পুলিশ প্রধানের প্রশ্ন ছিল, তাঁকে না জানিয়ে কেন অপারেশন হচ্ছে। তিনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ে ফোন করে দেন। তবে সেদিনও পাকিস্তানের F-16 ওই বাড়ির দিকে গিয়েও অজানা কারণে পালিয়ে গিয়েছিল।

রাত ১.২০। রহস্যজনক বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে সিল নেভির করা গুলিতে মাথা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাওয়া লাদেনের মৃত দেহ। মিনিট চল্লিশের অপারেশন ছিল। মার্কিন সেনার গতিতে উড়ে গিয়েছল টিম লাদেন। ঘটনার পরের দিন, সেই দুই যুবকের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।