সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এপার বাংলার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল ওপার। কথা ছিল অভিযান সেরে এসে ঘুরতে যাবে বাংলাদেশের বান্দারবানের পাহাড়ে। হল না। আশায় আশায় বুক বেঁধেছিল তনবীর, আশরাফুলরা। কথা রাখলেন না এপার বাংলার কুন্তল। ফিরেই এলেন না কাঞ্চনজঙ্ঘা জয় করে। সারা জীবনের জন্য ‘বাসা’ বেঁধে নিয়েছেন চির ঘুমের দেশে।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম দর্শনীয় স্থান বান্দরবান৷ তুষারের হাতছানি না থাকলেও দুর্গম এই এলাকা৷ বিভিন্ন পাহাড়ের উচ্চতা পর্বতারোহীদের কাছে আকর্ষণীয়৷ সেসব জানিয়েই বাংলাদেশের বন্ধুরা কুন্তল কাঁড়ারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন৷ বন্ধুদের আহ্বানে কুন্তলের ইচ্ছে ছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্রে যাওয়া৷

কুন্তল কাঁড়ারের বাংলাদেশি বন্ধু শোকাহত তনবীর ইসলাম লিখেছেন , “আর আপনার সাথে বান্দারবান যাওয়া হলো না, আর কোন দিন দেখা হবে না। ভালো থাকবেন ওপারে।” মর্মাহত তাঁর ওপার বাংলার বন্ধু আশরাফুল হকও। তিনি লিখেছেন , “শেষবার যখন ফেসবুকে কুন্তল দা’র সাথে কথা হয় তখন বলেছিলেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিট থেকে ফিরে আবার বাংলাদেশে আসবেন। সবাই মিলে বান্দরবান যাব। সেই যাওয়া আর হলো না। কাঞ্চনজঙ্ঘা তার কাছে রেখে দিল দাদাকে। ভাল থাকবেন কুন্তল দা। আপনার মতো এতো অমায়িক মানুষ আমি জীবনে খুব বেশি দেখিনি। ভাল মানুষগুলোই পৃথিবী ছেড়ে আগে চলে যায়। ওপারে ভালো থাকবেন। Dada you climbed high, now you’ll sleep high.” দাদা নাকি বলতেন, পাহাড়ে গেলে সবসময় মনে রাখবি বাড়ি ফিরতে হবে।

আবু বাকার সিদ্দিকি লিখেছেন , “আমাদের কাছের সেই দাদা, বাংলাদেশি দের আপন করে নেয়া সেই দাদাই আজকে কাঞ্চনজঙ্ঘার বুকে রয়ে গেলেন। Kuntal Karar, আল্লাহ তায়ালা দাদার পরিবারকে ধৈর্য্য ধরার তৌফিক দেন।” শোকাহত বন্ধু জসীম উদ্দিন লিখেছেন , “পাহাড়ের মানুষ পাহাড়েই থেকে গেলেন।” কুন্তল কাঁড়ারের এমন বহু পরিচিতই আজ শোকাহত। অবাক হয়ে গিয়েছেন তাঁর অনেক কাছের মানুষরা। মেনে নিতে পারছেন না যে , শৃঙ্গ জয় করেও বাড়ি ফেরা হল না তাঁদের প্রিয় মানুষটির।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন কুন্তল। ব্যবসায়ী কুন্তল ২০১৭ সালে এভারেস্ট জয়ের পরে খরচের অঙ্ক মেলাতে বসে বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন। সেই অঙ্ক সমাধান হতে না হতেই আরও কঠিন অঙ্ক কষা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বরাবরের মতো পাশে দাঁড়িয়েছিল তাঁরই ক্লাব ‘হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট মাউনটেনিয়ার্স অ্যান্ড ট্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন’, তাঁর পাড়ার ক্লাব ‘অন্নপূর্ণা ব্যায়াম সমিতি’ ও অন্যান্য শুভানুধ্যায়ীরা। কিন্তু অভিযানের খরচ যে লক্ষ লক্ষ টাকা। সেই খরচ সামাল দিতে ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে, আরও অনেক জায়গায় ধারদেনা করেই বেরোতে হয়েছিল দুর্গম অভিযানে।

যারা তাঁকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বা কোনও স্বল্প পরিচয়ের মাধ্যমে অনেকটা চিনেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল কুন্তল কাঁড়ারের বেশ কয়েকজন বাংলাদেশের বন্ধু। তাঁরাও আজ শোকাহত। অভিমান একটাই এপার বাংলার ছেলে কথা দিয়ে কথা রাখলেন না।

সামিট সম্পূর্ণ করে ফেরবার পথে ডেথ জোনে আহত অবস্থায় আটকে মারা যান পর্বতারোহী কুন্তল কাঁড়ার। উদ্ধার অভিযান চলার সময় ক্যাম্প-৪ এর কিছু উপরে কুন্তল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আহত বাঙালী পর্বতারোহীদের উদ্ধারের জন্য যাওয়া নির্মল পূর্জা, গেসমান তামাং, মিংমা ডেভিড শেরপা ও পিক প্রমোশন এজেন্সির শেরপারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও উদ্ধার কাজ স্থগিত করে ক্যাম্প-৪ এ চলে আসেন।

কাঞ্চনজঙ্ঘা বেস ক্যাম্পে থাকা মহারাষ্ট্রের পর্বতারোহী দল ‘গিরি প্রেমী’ নেতা উনেশ জিরপে ও অভিযানের দায়িত্বে থাকা এজেন্সি থেকে জানা গিয়েছে আটকে পড়া পর্বতারোহী দুজনকে উদ্ধারের জন্য পুনরায় কোনও অভিযান পরিচালনা করার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাই কুন্তলের দেহ যে কবে তাঁর বাড়িতে ফিরবে তার কোনও তথ্য নেই।