সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া : বছর বারোর ছেলেটা ছুটতে ছুটতে মাঠে এসে দাঁড়ালো। এদিক ওদিক তাকিয়েই এক ক্লাব কর্তাকে জিজ্ঞাসা করল , “কুন্তল কাকাকে আর দেখতে পারবো না?” ক্লাব কর্তা ছেলেটিকে পথ দেখিয়ে দিলেন। ছেলেটি এগিয়ে গেল মৃত পর্বতারোহী কুন্তল কাঁড়ারের কফিনের দিকে। ঠিক পিছন দিকে একটা ঘর। সেখানে জটলা হয়েছে। মানুষ একে একে আসছে ফুল মালা দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যাচ্ছেন।

পিছনের ওই জটলা থেকে হঠাৎ কান্নার রোল উঠল। তার মাঝেই বেজে উঠল বিউগেল। কান্নার শব্দ হারিয়ে গেল। মানুষের ভিড় দাঁড়িয়ে রয়েছে অবিন্যস্ত ভাবে। ছুটির সকালটা এমন ভাবেই ঘেঁটে গিয়েছিল অন্নপূর্ণা ব্যায়াম সমিতি সংলগ্ন অঞ্চল। চেনা অচেনা সবাই যেন আজ শেষবারের মতো কুন্তলকে দেখতে চায়।

গত ১৫ মে কুন্তল কাঁড়ার সামিট ক্যাম্পে পৌঁছে হাই-অল্টিচুড পালমোনারি এডেমা নামক অতিউচ্চতাজনিত শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হন। পাহাড়ের কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পাহাড় অন্ত প্রাণ যুবক। পাহাড় থেকে দেহ ফিরিয়ে এনে রবিবার সকালে কলকাতার পিস হেভেনে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে দেহ প্রথমে আনা হয় হাওড়ার ডুমুরজলায় কুন্তলের পর্বতারোহণ শিক্ষার ক্লাব হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট মাউন্টেনিয়ার্স অ্যান্ড ট্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রাঙ্গনে। সেখান থেকে দেহ আসে ব্যাঁটরা অন্নপূর্ণা বারোয়ারী ও হাওড়া অন্নপূর্ণা ব্যায়াম সমিতি ক্লাবে। এখান থেকে কাঁধে করে কফিনবন্দি দেহ নিয়ে আসা হয় কুন্তলের কাঁড়ারপুকুরের বাড়িতে। বৃদ্ধ বাবা মা সহ পরিবারের আত্মীয়েরা তাঁকে চোখের জলে বিদায় জানান। ফের দেহ আসে অন্নপূর্ণা ক্লাব প্রাঙ্গনে।

এখানে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী অরূপ রায়, লক্ষ্মীরতন শুক্লা, আইএফএ এর সহ সভাপতি শ্যামল মিত্র, পর্বতারোহী কিরণ মুখোপাধ্যায়, মলয় মুখোপাধ্যায়, স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ দেবাশিস রায়, হাওড়া পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান অরবিন্দ গুহ প্রমুখ। অন্নপূর্ণা স্কাউট গ্রুপের সদস্যরা কুন্তলকে সম্মান জানায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর দেহ শ্মশানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

হাওড়ার ওই চত্বরের মানুষ খুব শৃঙ্খলাপরায়ণ নয়। রবিবারের ছুটির সকাল হলেও মাংসের দোকানে ভিড়। সবার আগে চাই। তারসঙ্গে গাড়ির প্যাঁ পোঁ শব্দ লেগেই রয়েছে। ছুটির দিনে হলেও সকালবেলার দিকটা জমজমাট থাকে রাস্তাঘাট। ২৬ মে ২০১৯-র সকালটা সম্পূর্ণ আলাদা। শান্ত , শৃঙ্খলাবদ্ধ। বিশাল মিছিল করে শেষযাত্রায় কুন্তল কাঁড়ার। একটাও শব্দ নেই। এলাকায় ‘পিন ড্রপ সাইলেন্স’, অথচ চুপ থাকতে হবে সম্মান জানাতে নীরবতা পালন করতে হবে এমন কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। তবু সবাই চুপ। সবার খুব প্রিয় ছিল কুন্তল। তাই হয়তো সবাই স্তম্ভিত, অবিন্যস্ত, নীরব। কাতারে কাতারে মানুষ এসে হাজির হয়েছেন অন্নপূর্ণা ক্লাবের মাঠে। আবদার কুন্তলকে একবার দেখতে চাই। অনেকে কুন্তলকে চেনেনও না। তবু ছুটে এসেছেন শেষবার দেখতে। বাপ্পা যেমন দাসনগর সিআইটি থেকে বাবার সঙ্গে এসেছিল ‘কুন্তল কাকা’কে দেখতে।

মাঠে মানুষের ঢল আছড়ে পড়েছিল। অনেকেই তাই মাঠের বাইরে থেকে দেখলেন শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠান। কেউ আবার সকালেই জ্যৈষ্ঠের ঠা ঠা রোদে দাঁড়িয়ে রইলেন। অপেক্ষা করলেন। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল পৌনে ৯টা। সমস্ত শ্রদ্ধা কাঁধে বেঁধে ক্লাবপ্রাঙ্গন ছেড়ে বেরোল কুন্তল কাঁড়ারের দেহ। প্রত্যেক মোড়ে মোড়ে কুন্তলের প্রতি শোক বার্তা। গাড়ি বেরোল ক্লাবের গলি থেকে। একটা কাক এসে বসল ক্লাবের ছাদে। সমানে ডেকে চলল। নীরবতা ভেঙে যেন বলতে চাইল ‘চল কুন্তল, চল’। আমরা সবাই তোমার সঙ্গে রয়েছি। তুমি এগিয়ে চল। এগিয়ে গেল কুন্তল, শুধু ফিরল না প্রাণবন্ত শরীরটা।