সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীরামপুর: ‘হাল্লা চলেছে যুদ্ধে’। ঠিক এমনভাবেই বনেদী বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল গোড়া সৈন্যের দল। তারপর ত্রাহি ত্রাহি বুটের শব্দ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে যে। ইংরেজ সৈন্যরা জায়গা দখল নিতে চাইছে শ্রীরামপুরের বাড়িতে। ভেঙে দিতে চাইল চণ্ডীমণ্ডপ। তারপরেই এক অদ্ভুত ঘটনা। পিছু হঠল সেনা। কি সেই ঘটনা?

রোমহর্ষক বললেও ভুল হবে না। এমনই ‘গল্প হলেও সত্যি’ কথা জড়িয়ে রয়েছে কুণ্ডু বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে। ১৩২ বছরের পুরনো দুর্গোৎসব। তিলক কুণ্ডুর হাত ধরে মা আসেন শূদ্রদের বাড়িতে। সে যুগে পরতে পরতে জাতপাতের গোঁড়ামি ছিল। সমস্ত সমস্যা দূরে ঠেলে ব্যবসায়ীর বাড়িতে শুরু হয় পুজো। এর মাঝেই ১৯৪২ সালে লাগে বিশ্বযুদ্ধ। ইংরেজরা ব্যবহার করছিল ভারতীয় সেনাদের। সঙ্গে ছিল নিজেদের সৈন্যও। এদিকে সেনার থাকার জন্য জায়গা প্রয়োজন। সেনা ছাউনি হিসাবে তখন তাদের টার্গেট বড় বাড়ি। যেখানে একসঙ্গে অনেক সেনা থাকতে পারবে। সেই বাড়ির তালিকায় অন্যতম শ্রীরামপুরের কুন্ডুদের বাড়ি।

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীরাম হঠাৎ করেই সকাল বেলা হানা বন্দুকধারি সৈন্যদের। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় কুণ্ডুদের। দিলীপ কুণ্ডু বলেন, “আমার তখন ১০-১১ বছর বয়স। ক্যাপ্টেন স্কট নামে এক ইংরেজ সৈনিক অর্ডার দিলেন দুর্গা মণ্ডপ ভেঙে দিতে। ওদের আরও জায়গা প্রয়োজন। বুট পড়া সেনা ভাঙতে যায় চণ্ডী মণ্ডপ। তখনই হঠাৎ থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে পায়ের তলা। সৈন্য দল ভয়ে পালাবার পথ খুঁজছে। কর্নেল মুখার্জি তাড়াতাড়ি সেখানে এসে পৌঁছে সঙ্গে সঙ্গে মণ্ডপে হাত না দেওয়ার নির্দেশ দেন।”

এরপরের পাঁচ বছর পুজো করা সম্ভব হয় নি কুণ্ডুদের। স্বাধীনতার পর নতুন করে পুজো শুরু পরিকল্পপ্না এলে অনেক কর্তা নিমরাজি ছিলেন। খরচ কে বহন করবে এসব নিয়ে প্রচুর সমস্যা হয়। দিলীপবাবু বলেন, “ মা ভোরবেলা স্বপ্ন দেখেন দুর্গা শিব সবপরিবারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন চণ্ডীমণ্ডপে। জিজ্ঞাসা করছেন, ‘তোদের এত অভাব? দিন পাঁচেক আমাদের খাওয়াতে পারবি না?’ ঘুম ভেঙে স্বামিকে ঘটনা বলে পুজো বন্ধ না করার কথা জানান বাড়ির বড় গিন্নি। শেষে একাই এগিয়ে আসেন জীবন কৃষ্ণ কুণ্ডু অর্থাৎ দিলিপবাবুর বাবা।

বছর পাঁচেক একা হাতে পুজো এগিয়ে নিয়ে যান জীবনবাবু। পরে তার সঙ্গে পুজো করতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বাকিরাও। মাটির ঠাকুরদালান পাকা হয়। আবারও ঢাক বাদ্যির মহাসমারোহে শুরু হয় শক্তির আরাধনা।

বহু ঝড় ঝাপটা গিয়েছে কুণ্ডু বাড়ির উপর দিয়ে। তবু মা এই বছরেও আসছেন তাঁদের ঠাকুর দালানে। ইংরেজ সৈন্য খেদিয়ে তিনি এমনই তেজস্বিনী।