সৌমেন শীল, কলকাতা: সারদা কাণ্ডে গ্রেফতারের পর দলের সঙ্গে বেড়েছিল দূরত্ব। দল থেকে সাসপেন্ডও করা হয়েছিল। দলের বিভিন্ন নেতা এমনকি দলনেত্রীর বিরুদ্ধেও মুখ খুলেছিলেন সংবাদ মাধ্যমের সামনে। সেই তিনিই এখন মঞ্চ ভাগ করে নিচ্ছেন তৃণমূলের প্রথম সারির নেতাদের সঙ্গে।

আলোচিত ব্যক্তির নাম কুণাল ঘোষ। সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে করতেই তৃণমূলের সঙ্গে যার সখ্যতা বেড়েছিল। ২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরের বছরে তাকে সাংসদ করে রাজ্যসভায় পাঠান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সাংসদ-সাংবাদিক কুণাল ঘোষকে ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে সারদা কাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে গ্রেফতার করা হয়। আরও বড় বিষয় হচ্ছে কেন্দ্রীয় সংস্থা কুণালবাবুকে গ্রেফতার করেনি। সারদা তদন্তে রাজ্য সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল তাঁকে গ্রেফতার করেছিল।

সেই সময়েই রাজ্যসভায় সাংসদ কুণাল ঘোষকে দল বহিষ্কার করে। সেই বহিষ্কার নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে। প্রায় চার বছর তিনি জেলে ছিলেন। তখনই বিভিন্ন সময়ে সংবাদ মাধ্যমের সামনে তৃণমূলের নেতাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন কুণাল। যা নিয়ে বিতর্কও কিছু কম হয়নি।

সেই কুণাল ঘোষকেই এখন দেখা যায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। স্থানীয় নেতাদের আয়োজিত অনুষ্ঠান তো বটেই। গত ২১ শে জুলাইয়ের মঞ্চেও দেখা গিয়েছিল রাজ্যসভার এই প্রাক্তন সাংসদকে। যদিও মূল মঞ্চে উঠতে পারেননি কুণাল। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছিলেন তিনি। শুক্রবার সেই কুণালকেই তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে একমঞ্চে দেখা গেল।

এদিন ব্রিগেড সমাবেশের প্রচারের জন্য শ্যামবাজারে সভার আয়োজন করে তৃণমূল। সেই সভার মূল বক্তা ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঞ্চে হাজির ছিলেন সুদীপ ও নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, শশী পাঁজা, ফিরহাদ হাকিমের মতো ব্যক্তিরা। তাঁদের সঙ্গে এক সারিতে হাজির ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ কুণাল ঘোষ। সেই সভার ছবি ফেসবুকে আপলোড করে অভিষেক সম্পর্কে লিখেছেন, “শ্রীমান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণ এই প্রথম আমি সামনে বসে দেখলাম এবং শুনলাম। শুক্রবার শ্যামবাজারে। ব্রিগেড সভার প্রচারে। বিরাট সভা। অভিষেক চমৎকার বলল। দ্রুত পরিণত হচ্ছে প্রমাণিত।”

অভিষেক সম্পর্কে কুণাল ঘোষ আরও লিখেছেন যে অতক্ষণ একটানা উচ্চমার্গে সভা জমানো ভাষণ বড় কম কথা নয়। দেখলাম তথ্য, যুক্তি, আবেগ এবং আক্রমণ, বেশ সুন্দর মিশ্রণ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি খোঁচা দিয়েছেন সিপিএম নেতাদের। প্রাক্তন সাংসদ লিখেছেন, “অভিষেককে ঘিরে ভিড় আর উন্মাদনা যা দেখলাম, তা দেখলে বামফ্রন্ট নেতারা একটা বিষয়ে আফশোস করতে পারেন, কেন তাঁরা নতুন যুগের মুখকে প্রতিষ্ঠা করে যান নি।”

২০১১ সালের রাজ্যের ক্ষমতা দখল করার পরে ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে জয় উদযাপন করেছিল তৃণমূল। ব্রিগেডে আয়োজিত সেই সভায় সঞ্চালক ছিলেন কুণাল ঘোষ। পরে তাঁকে সাসপেন্ড করা হলে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ে। সেই সাসপেন্ডেড সাংসদ ফের দলের প্রথম সারির নেতাদের মঞ্চ ভাগ করে নিচ্ছেন। যা থেকে তৈরি হচ্ছে নয়া জল্পনা। তাহলে কুণাল ঘোষ কী আবার রাজনীতির মূল ময়দানে?

এই বিষয়ে কুণাল ঘোষ বলেছেন, “আমায় ডাকা হয়েছিল তাই আমি গিয়েছিলাম। পুরনো মানুষেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ভালোই লাগে।” ফের কী রাজ্য বা কেন্দ্রের আইনসভায় দেখা যাবে এই প্রাক্তন সাংসদকে? এই প্রশ্নের জবাবে কুণালবাবু বলেছেন, “ভবিষ্যতের কথা সময় বলবে। আমি এখন অনেক মামলা নিয়ে ব্যস্ত আছি। অন্য কিছুই ভাবছি না।”

২০১৭ সালের পুজোর সময় কুণালের পাড়ার পুজো উদ্বোধনে দেখা গিয়েছিল একদা তৃণমূলের দুই নম্বর ব্যক্তি মুকুল রায়কে। তখন তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছেন মুকুল। পাশাপশি তাঁর বিজেপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। সেই সময় মুকুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কুণালের বিজেপি যোগের ইঙ্গিত দিয়েছিল। যদিও সেই জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছিলেন কুণাল। রাহীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয় না তা অভিজ্ঞ সাংবাদিক কুণাল বেশ ভালই জানেন এবং বোঝেন। তিনি নিজে এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী। সময়ই সব জানিয়ে দেয়।