সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ফরোয়ার্ড ব্লক বিশ্বাস না করতে পারে নেতাজী এমিলিকে বিবাহ করেননি। এখনও সেই বিতর্ক তারা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু কৃষ্ণা বসু ও তাঁর ‘নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো’-তে রাখা নেতাজীর সহস্তে লেখা চিঠি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে। হ্যাঁ, নেতাজি বিবাহ করেছিলেন। তাঁদের মেয়েই অনিতা বসু। বিবাহের পরে যিনি অনিতা পাপ। সেই চিঠিতে স্ত্রী কন্যার বসু পরিবারে স্বীকৃতি চেয়েছিলেন সুভাষ।

বিতর্কের অন্যতম কারণ হিসাবে অনেকক্ষেত্রেই একটি বিষয়কে উল্লেখ করা হয়েছে। কি সেই কারণ? বলা হচ্ছে সুভাষচন্দ্র ১৯৩৯ সালের ২৩ নভেম্বর চীন ভ্রমণের ভিসার আবেদনপত্রে উল্লেখ করেছেন তিনি অবিবাহিত আর স্বহস্তে স্বাক্ষর করেছেন।(পশ্চিমবঙ্গের রাজ‍্য মহাফেজখানার নথি – নং ৫২৪/৩৯)। কিন্তু কৃষ্ণা বসুর লেখা ‘আ ট্রু লাভ স্টোরি-এমিলি অ্যান্ড সুভাষ’ বইতে স্পষ্ট লেখা হয়েছে নেতাজী ও এমিলি ১৯৩৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর বিবাহ করেছিলেন। এই তথ্য তারা অনেক পরে জানতে পারেন। যারা এই তথ্য বিশ্বাস করেন না , বা এই তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন তাদের নেতাজীর নিজের হাতের লেখা চিঠি ধন্ধে ফেলতে পারে। চিঠিতে সুভাষ তাঁর ফিরে না আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। স্পষ্ট লিখেছেন তাঁর বিবাহ ও মেয়ের কথা। লিখেছেন যেন তিনি না থাকলে তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে যেন গ্রহন করে তাঁর পরিবার। এই চিঠিই তাঁর লেখা শেষ চিঠি যা তিনি দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র বসুকে।

কি লেখা আছে সেই চিঠিতে? বার্লিন ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩ সালে সুভাষ তাঁর মেজদাদা শরৎচন্দ্র বোসকে লিখেছেন , ‘আজ পুনরায় আমি বিপদের পথে রওনা হইতেছি। এবার কিন্তু ঘরের দিকে। হয় তো পথের শেষ আর দেখিব না। যদি তেমন বিপদ পথের মাঝে উপস্থিত হয় তাহলে ইহজীবনে আর কোনও সংবাদ দিতে পারিব না। তাই আমি আমার সংবাদ এখানে রাখিয়া যাইতেছি। – যথা সময়ে এই সংবাদ তোমার কাছে পৌঁছিবে।’ এরপরেই নিজের স্ত্রী ও মেয়ের কথা উল্লেখ করেছেন নেতাজী। তিনি লিখেছেন, ‘আমি এখানে বিবাহ করেছি এবং আমার একটি কন্য হইয়াছে। আমার অবর্তমানে আমার সহধর্মিণী ও কন্যার প্রতি একটু স্নেহ দেখাইবে – যেমন সারা জীবন আমার প্রতি করিয়াছ। আমার স্ত্রী ও কন্যা আমার অসমাপ্ত কার্য শেষ করুক – সফল ও পূর্ণ করুক – ইহাই ভগবানের প্রতি আমার শেষ প্রার্থনা।’ চিঠির শেষে লেখা রয়েছে । ‘আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহন করিবে – মা , মেজ বৌদিদি এবং অন্যান্য গুরুজনকে। ইতি তোমার স্নেহের ভ্রাতা সুভাষ।’

এবার বিতর্ক এখানেও থামতে না পারে কারণ এখানে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি অনেকেই বলতে পারেন কি প্রমাণ রয়েছে ওই লেখা নেতাজীরই। তবে তো প্রশ্ন উঠতে পারে নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো এবং কৃষ্ণা বসুর লেখা বই নিয়ে। প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। তবু বাস্তব তো বাস্তবই হয়।

কৃষ্ণা বসুর সন্তান প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুগত বসুর লেখা ‘হিজ ম্যাজেস্টিজ অপোনেন্ট-সুভাষ চন্দ্র বসু অ্যান্ড ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল এগেইনস্ট এম্পায়ার’-এ লিখেছেন, এমিলির সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই সুভাষের জীবনে একটা নাটকীয় পরিবর্তন এসেছিল। দুজনের মধ্যে প্রেমপত্র বিনিময় হত। এমিলিকে উদ্ধৃত করে সুগত বসু তার বইতে লিখেছেন, প্রেমের আভাসটা সুভাষ চন্দ্র বসুর দিক থেকেই এসেছিল। ১৯৩৪-এর মাঝামাঝি সময় থেকে পরের বছর দু’য়েক অস্ট্রিয়া আর চেকোস্লোভাকিয়াতে থাকার সময় সম্পর্কটা আরো মধুর হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধের সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোতে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য সাহায্য পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপের মধ্যে সুভাষচন্দ্র নিজের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতেন। তারপর চিঠিতে উঠে আসে দু’জনের আবেগঘন কথোপকথন।

সুভাষ চন্দ্র এক চিঠিতেই লিখেছিলেন, ‘আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। হতে পারে, পুরো জীবনটাই হয়তো জেলে কাটাতে হবে, অথবা আমাকে গুলি করা হবে, কিংবা ফাঁসিও হতে পারে। এও সম্ভব যে তুমি হয়তো আমাকে কখনো আর দেখতেই পাবে না, অথবা আমি হয়তো কখনো তোমাকে চিঠিও লিখতে পারব না। কিন্তু ভরসা রেখ, তুমি চিরকাল আমার হৃদয়ে থাকবে, আমার মনে, আমার স্বপ্নে থাকবে। যদি এই জীবনে সম্ভব না হয়, তাহলে পরের জীবনে তোমার সঙ্গেই থাকব আমি।’

এই চিঠি দেওয়া-নেওয়ার পালার মাঝেই যেবার এমিলি আর সুভাষের দেখা হয়েছিল, তখনই তারা বিয়ে করেন। ১৯৩৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাদের বিয়ে হয়েছিল অস্ট্রিয়ার বাদগাস্তিনে। দুজনেরই পছন্দের রিসর্ট ছিল ওটা। তবে দুজনেই নিজেদের বিয়ের ব্যাপারটা গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই অজানা কথাই লেখা রয়েছে ড. কৃষ্ণা বসুর ‘আ ট্রু লাভ স্টোরি-এমিলি অ্যান্ড সুভাষ’।