দেবযানী সরকার: রোমান্টিক সলমন ও আমিরের বাহুবলী ইমেজে সরগরম বলিউড৷ খুশি সুলতান, দঙ্গল দেখে৷  অথচ ঐতিহ্যবাহী কুস্তির আখড়ায় তালা পরলেও বিচলিত নয় বাংলার তরুণ প্রজন্ম৷ গগন নারাঙ, সুশীল কুমার, যোগেশ্বর, সাক্ষী মালিকদের নিয়েই তারা গর্বিত৷ এটা ঠিকই৷ তবে কখনও কখনও এক বাঙালি হাতের ‘রদ্দা’ খেয়ে কুপোকাত হয়েছিলেন ভয়ানক পালোয়ানরা৷ সুলতান ও দঙ্গলের উচ্ছ্বাসকে একটু পাশে রেখে খুঁজে দেখা সেই ধুসর অতীতকে৷

সুলতান ছবির একটি দৃশ্য
সুলতান ছবির একটি দৃশ্য

উনিশ শতক৷ ‘বাবু কলকাতার বিবি বিলাস’ তখন বিশেষ সম্মান পায়৷ পায়রা ওড়ানো হাতে টাকার জোরে  ঘরের বউকে ভুলে ‘বাইরের বিবি’-দের বশ করা ছিল বিশেষ কদর৷ এরই মাঝে কয়েকজন ছিলেন ভিন্ন৷ তাঁরাও বাঙালি বাবু৷ তবে শক্তিমান৷ সেই গুটিকয় বলশালীদের কারণে ‘বাবু’ সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ হয়েছিল কুস্তি ৷ বিভিন্ন আখড়ায় নিয়মিত চর্চা হত কুস্তির। এমনকি কবিগুরুও নিয়মিত কুস্তি চর্চা করতেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘জীবনস্মৃতি’-তে লিখছেন —‘ভোরে অন্ধকার থাকিতে উঠিয়া লংটি পরিয়া প্রথমেই এক কানা পালোয়ানের সঙ্গে কুস্তি করিতে হইত।’কিন্তু আধুনিকতার পালের হাওয়ায় বাঙালির শক্তিমত্তা ও শরীরী দক্ষতা এখন বিশ্রামাগারে৷

কলকাতার বর্ণময় কুস্তির ইতিহাস এখন ধুলোর চাদরে৷এমনই এক আখড়া আছে উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান স্ট্রিটে (গোবর গোহ সরণী)৷ হেদুয়া পার্ক সংলগ্ন এই রাস্তাতেই রয়েছে কিংবদন্তী কুস্তিগীর গোবর গুহর আখড়া৷ ভারতীয় তথা বাংলার কুস্তি বা মল্লযুদ্ধকে যারা বিশ্বের দরবারে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করেন তারা হলেন, কলকাতার গুহ পরিবারের অম্বু গুহ ও তার উত্তরপুরুষ ক্ষেত্র গুহ তারপর পঞ্চানন গুহ এবং সর্বোপরি যতীন্দ্র চরণ গুহ গিনি গোবর গুহ(গোহ) নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনিই ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের কুস্তি শিক্ষার গুরু।

ইনসেটে গোবর গোহ
ইনসেটে গোবর গোহ

সাহিত্যে অনুরাগী আবার রদ্দা মারতেও ওস্তাদ তিনি৷ বলশালী বাঙালি গোবরা পালোয়ানের কথা জানত আসুমদ্র হিমাচল থেকে সাগার পারের দুনিয়া৷ ভারতীয় কুস্তিকে বিশ্বের দরবারে এক উচ্চ স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।  বহু নতুন প্যাঁচের উদ্ভাবন করেন। তার উদ্ভাবিত ধোঁকা, টিব্বি, গাধানেট, ঢাক, টাং, পাট, ধোবা পাট, কুল্লা ইত্যাদি ভারতীয় কুস্তি রীতিতে সংযোজিত হয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রচলিত -রদ্দা। ভীমের মতো চেহারার গোবর বাবুর রদ্দায় আখড়ার মাটিতেই খাবি খেয়েছিলেন অনেক কুস্তিগির৷

১৯২১ সালে সানফ্রান্সিকোতে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব মল্লযুদ্ধ৷  সেই প্রতিযোগিতায় লাইট-হেভিওয়েট বিভাগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন গোবর গুহ৷

গোবরবাবুর আখড়ায় কুস্তি করতে আসতেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মান্না দে প্রমুখ। ব্যায়ামবীরদের মধ্যে নীলমণি দাস, বিষ্ণুচরণ ঘোষ, মনোহর আইচ, মনতোষ রায় প্রত্যকেই আসতেন তার আখড়ায়। ১৯৫২ অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী কুস্তিগীর খাশাবা দাদাসাহেব যাদব (কে ডি যাদব) গোবর গুহর আখড়াতেই কুস্তির পাঠ নিয়েছিলেন। ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন বনমালী ঘোষ, জ্যোতিষচরণ ঘোষ ও বিশ্বনাথ দত্ত।

গোবর গোহোর কুস্তির আখড়া৷ ছবি-শশী ঘোষ
গোবর গোহোর কুস্তির আখড়া৷ ছবি-শশী ঘোষ

কলকাতার গুহ পরিবার শরীরচর্চা ও শরীরচর্চার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য পরিচিত ছিল। গোবরের পিতামহের পিতামহ শিবচরণ গুহ আধুনিক বঙ্গের প্রথম আখড়াটি স্থাপন করেন কলকাতার হোগোলকুঁড়িয়ায়, বর্তমান মসজিদবাড়ি স্ট্রীটে। পিতামহ অম্বিকাচরণ গুহ বা অম্বুবাবু ছিলেন নামকরা কুস্তিগীর। বঙ্গে আখড়া সংস্কৃতির প্রচলনের পথিকৃৎ মনে করা হয় তাঁকে। পিতা রামচরণ গুহও ছিলেন কুস্তিগীর। তার কাকা ক্ষেত্রমোহন গুহ অথবা খেতুবাবু ছিলেন নামকরা কুস্তিগীর।
পরবর্তীকালে গোবর তাদের পারিবারিক আখড়ার পরিচালনা করতেন। ১৯৩৬ সালে তিনি মসজিদবাড়ি স্ট্রীটের আখাড়াকে উঠিয়ে নিয়ে চলে আসেন হেদুয়ার কাছে গোয়াবাগান স্ট্রিটে(অধুনা গোবর গোহ সরণী)৷

গোবর গোহের ছেলে ও নাতিরা কুস্তি শিখলেও সেভাবে পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি৷গোবরের মৃত্যুর পর আখড়া সামলেছেন তাঁর মেজ ছেলে জয়ন্ত গোহ৷তবে অনেকবছর আগেই কুস্তি শেখার পাঠ চুকেছে বলে জানিয়েছেন তিনি৷ আইনজীবী জয়ন্তবাবুর কথায়, শরীর চর্চার ইচ্ছা আজকের প্রজন্মের নেই এই কথা সঠিক নয়। তবে তরুণ প্রজন্ম চলে যাচ্ছে মাল্টি জিমগুলিতে। আমাদের এখানেও জনা ২০ ছেলে এখন জিম করে৷

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিভিন্ন কুস্তির আখড়াগুলি একসময় বিপ্লবীদের গোপন ডেরা ছিল। বিভিন্ন আখড়ায় অনুশীলন সমিতির কার্যকলাপ পরিচালিত হওয়ার কথা জানা যায়।তবে স্বাধীনতার পর থেকে কলকাতায় জৌলুস হারাতে থাকে কুস্তি৷

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।