বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: সাত মাস আগে তাঁর বাবা-ও নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন৷ তবে, জীবিত অবস্থায় তাঁর বাবাকে আর ফেরাতে পারেনি পুলিশ৷ শেষ পর্যন্ত লাশকাটা ঘরে ডাঁই করে রাখা ৪৮টি দেহ সরিয়ে তাঁর বাবাকে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি৷ আর, তাঁর ছেলে?

না৷ তাঁর ছেলের খোঁজ এখনও মেলেনি৷ সাড়ে ১৮ বছর আগে, এক বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির কাছে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল তাঁর আট বছর ন’ মাস বয়সের ছেলে৷ খেলা শেষে ওই সন্ধ্যায় ঘরেও ফিরছিল সে৷ তখন লোডশেডিং হয়েছিল৷ কিন্তু, তার পর থেকে আর কোনও খোঁজ মেলেনি ছেলের৷ কোন অন্ধকারে, কোথায় যে হারিয়ে গেল সে!

আর, তার পর, ছেলের জন্য কোথায় কোথায় না হন্যে হয়ে খোঁজ করেছেন তিনি৷ খুঁজে চলেছেন এখনও৷ তবে, লোডশেডিংয়ের ওই সন্ধ্যায় কীভাবে যে অন্ধকার হয়ে গেল তাঁর কোল, সেই বিষয়ে এখনও তাঁর কাছে নেই কোনও সদুত্তর৷ এখনও তার কারণ জানেন না ওই মা৷ এখনও তাঁর জানা নেই, ওই সন্ধ্যার লোডশেডিংয়ে কীভাবে অন্ধকারের মতো হয়ে গেল তাঁর সন্তান!

যেন উধাও হয়ে গিয়েছে তাঁর সন্তান! তবে, এখনও পথ চেয়ে রয়েছেন তিনি৷ এখনও প্রতিটি মুহূর্তে তিনি অনুভব করেন, এই বুঝি তাঁর ছেলে ফিরে এল ঘরে! এই বুঝি তাঁকে জড়িয়ে ধরল! মা বলে ফের ডেকে উঠল লোডশেডিংয়ের ওই সন্ধ্যায় কোনও অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া তাঁর ছেলে! আর, তাই, ছেলেকে ফিরে পেতে এ বার ফেসবুকে-ই ভরসা রাখলেন ওই মা৷image

তাঁর কথায়, ‘‘ফেসবুকে অনেকে খুঁজে পাচ্ছেন হারিয়ে যাওয়া তাঁদের প্রিয়জনদের৷ আমার ছেলেকে খুঁজে দিতে পারেনি আইন৷ তাই ফেসবুকের মাধ্যমেই এ বার আমার ছেলের খোঁজ শুরু করলাম৷ আমার আশা, ফেসবুকের মাধ্যমে আমার ছেলেকে খুঁজে পাব৷ আমার ছেলেকে দেখলেই চিনতে পারব৷ আমার-ই মতো দেখতে আমার ছেলে৷’’ তিনি, তপতী কুণ্ডু৷ তিনি, দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির একজন কর্মী৷ তাঁর সহকর্মীদেরও এমন প্রত্যাশা, লোডশেডিংয়ের ওই সন্ধ্যায় কোন অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে ওই মায়ের সন্তান, একদিন না একদিন সেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে৷ ফেসবুকের মাধ্যমেই হয়তো সন্তানকে ফিরে পাবেন ওই মা৷ যে কারণে, হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরে পাওয়ার ওই প্রত্যাশা-আর্জি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন ওই মায়ের-ই এক সহকর্মী৷

কিন্তু, কী এমন হয়েছিল লোডশেডিংয়ের ওই সন্ধ্যায়, যার জেরে আর ঘরে ফিরে এল না তপতী কুণ্ডুর ছেলে শুভাশিস (ডাক নাম, গোপাল)? উত্তর নেই৷ কী হয়েছিল, সেই বিষয়ে এখনও গভীর অন্ধকারে রয়েছেন তিনি এবং তাঁর পরিজন-পরিচিতরা৷ বিস্ময়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছে তাঁর চোখ-মুখ৷ আর, ওই বিস্ময় যেন ক্রমে গভীর থেকে আরও গভীর হচ্ছে! লোডশেডিংয়ের জেরে যেভাবে আচমকা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল কলকাতার মসজিদ বাড়ি স্ট্রিটের ওই সন্ধ্যা, তারও থেকে যেন বেশি ছায়া ছড়িয়ে গিয়েছে তাঁর জীবনের প্রান্তে প্রান্তে! অথচ, এমনও কি হওয়ার ছিল? কেউ যে এই ভাবে উধাও হয়ে যেতে পারে, সেই বিষয়টিও মেনে নিতে চান না তপতী কুণ্ডু৷ পুলিশ-ই একসময় তাঁকে এমন বলেছিল, তাঁর ছেলের জন্য পুলিশ কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ করবে?

তবুও, হাল ছাড়েননি তিনি৷ তার উপর, দু’-দুইবার প্রিয়জন নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বেদনায় সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে৷ তাই, হাল ছাড়া নয়৷ বরং, আরও শক্ত করে হাল ধরেছেন তিনি৷ তপতী কুণ্ডু বলেন, ‘‘১৯৯৭-এর ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে, বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির কাছে জয়মিত্র মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল গোপাল৷ ওই যে ফুটবল খেলতে গেল, তার পর আর ফিরল না আমার ছেলে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ছেলে ফিরে না আসায় আমরা সব জায়গায় খোঁজ করতে থাকি৷ তার পর ওই রাতেই আমরা বটতলা থানায় জিডি করি৷ ছেলের বন্ধুদের কাছে জানতে পারি, ফুটবল খেলে ফেরার সময় লোডশেডিং হয়ে গিয়েছিল৷ আমার ছেলে ওর বন্ধুদের বলেছিল, ওরা বাড়ির দিকে এগিয়ে যাক৷ আর, গোপাল ফিরছে হাত-পায়ের কাদা ধুয়ে৷ তার পর থেকে গোপালের আর কোনও খোঁজ পেলাম না৷’’ অথচ, গোপালের খোঁজে বন্ধু-পরিচিতদের পাশাপাশি স্থানীয় থানা, লালবাজার, আশপাশের হাসপাতাল, সরকারি এবং বেসরকারি হোমেও গিয়েছেন তাঁরা৷

শুধুমাত্র তাই নয়৷ কলকাতার ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন৷ কেননা, এ ভাবে যে কেউ উধাও হয়ে যেতে পারে না! যে কারণে হয়তো সংশয়ও পিছু ছাড়েনি: তা হলে, কোনও দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নি তো গোপাল! ছেলের খোঁজে মুম্বইতে তাঁদের পরিচিতদের কাছেও গিয়েছিলেন তাঁরা৷ না৷ কোনও খোঁজ মেলেনি৷ বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল৷ দূরদর্শন এবং আকাশবাণীতে ঘোষণাও করা হয়েছিল৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ তপতী কুণ্ডু বলেন, ‘‘আমার ছেলের খোঁজে যাতে কোনও জায়গায় যেতে সমস্যায় পড়তে না হয়, তার জন্য সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের কাছ থেকে অনুমতিপত্র পেয়েছিলাম৷ কোথাও কোনও ছেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলে যখন যেখান থেকে খবর এসেছে, তখনই সেখানে গিয়েছি৷’’ এমনই বিভিন্ন উপায়ে একটানা দেড় বছর হন্যে হয়ে গোপালের খোঁজ করেছেন তাঁরা৷ তার পরেও, জারি রেখেছেন খোঁজ৷ প্রত্যাশা, একদিন না একদিন গোপাল ঘরে ফিরবেই ফিরবে৷

তপতী কুণ্ডুর কথায়, ‘‘ছেলে হারিয়ে যাওয়ার পর প্রতিবছর ওর জন্মদিনে আমরা পুজো দিতাম৷ আর বেশ কয়েকজনকে খাওয়াতাম৷ মনে করতাম, কোথাও না কোথাও রয়েছে আমার ছেলে৷ ওর যাতে কল্যাণ হয়, সেই জন্যই  জন্মদিনে ওই সব করতাম৷’’ তবে, ২০১২-য় তাঁর স্বামী দেবাশিস কুণ্ডুর মৃত্যুর পর আর গোপালের জন্মদিনে আগের মতো অনুষ্ঠান হয় না৷ তপতী কুণ্ডু বলেন, ‘‘আমার বাবা তখন মনে রাখতে পারত না৷ ২০১৫-র পয়লা অগস্ট বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় বাবা৷ বয়স ৭৫৷ খোঁজ করতে থাকি৷ পুলিশেও জানায়৷ ওই অগস্ট মাসের ১৮ তারিখ বাবার খোঁজ মিলেছিল নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ থেকে৷ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অগস্টের ২০ তারিখ বাবার দেহ পেয়েছিলাম৷ জানতে পেরেছিলাম, শিয়ালদহের ফুটব্রিজের ওখান থেকে বাবাকে মৃত অবস্থায় নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ৷’’

তবে, নিখোঁজ সন্তানের জন্য তাঁর ভরসা এখন ফেসবুক৷

___________________________________________________________________

আরও খবর:
(০১) ধরণী বেশি হয়ে গেলে বেচারা রাস্তার নাম হবে মরণী!
(০২) ‘পরিকল্পিত হত্যা’য় ডাক্তারের জরিমানা ২৫.৫ লক্ষ
(০৩) বিবিধের মাঝে দ্বেষ-প্রেমের উগ্র জাতীয়তাবাদের মিলন মহান!
(০৪) দুর্বারকে অচ্ছুৎ রেখে সোনাগাছিতে স্বাবলম্বন স্পেশাল
(০৫) সরকারি অর্থ মেলেনি বলে গরিব-বাড়ির ভরসা ক্লাব!
(০৬) হোয়াটসঅ্যাপে প্রার্থীর তথ্য জানবে #TagGeneration
(০৭) ভিন রাজ্যে পাড়ি জমাতে সোনাগাছির হাতিয়ার ফুটবল
(০৮) দাভোলকর-পথে কুসংস্কারের ক্রম মুক্তি হবে বাংলায়!
(০৯) সংবিধানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে বন্ধ সরস্বতী পুজো!
(১০) বাঙালি বলে নেতাজিকে হতে দেওয়া হয়নি প্রধানমন্ত্রী!!

___________________________________________________________________