রাহুল চক্রবর্তী, প্যারিস: ভাইরাস আশীর্বাদ না অভিশাপ ?? হ্যাঁ, নিঃসন্দে অভিশাপ!! এই মৃত্যু মিছিলের কাঁসর ঘন্টা যেখানে বেজেই চলেছে আর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন দৈনন্দিন জীবনের ধ্রুবক হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমাদের দেখা সবথেকে উৎকৃষ্ট মানের দুঃসপ্নকেও এই কোরোনা টেক্কা দিচ্ছে।

বিগত দুবছরে প্যারিস কে যেভাবে দেখে এসেছি তার সঙ্গে আজকের যেন কোনও মিল নেই, এক অদ্ভুত হাহাকার-চিত্র। প্রথম বিশ্বের দেশেও যে এরকম সংকট, খাদ্যাভাব নেমে আসতে পারে সেটা কল্পনাতীত। তার সঙ্গে আবার বিনামূল্যে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে গৃহবন্দি থাকার শাস্তি। যে শনি-রবিবারের জন্য স্কুল থেকে চাকরি জীবন সর্বদা অপেক্ষায় থাকতাম, সেই দুটি দিনই এখন সবথেকে অপ্রিয়। রান্নার বাসন থেকে বিছানা সবাই এখন বিরক্ত আমায় নিয়ে। এক টানা এত সময় তারা আমাকে দেখতে অভ্যস্ত ছিল না কখনওই।

যদিও অফিসের ল্যাপটপটা সব সময় সঙ্গ দিতে দুবার ভেবে দেখছে না। কিন্তু এসবের মাঝেও যেটা সবচেয়ে বিভীষিকাময় সেটা হলো ‘ওয়ার্ল্ড ও মিটার’ এর দৈনিক সমীক্ষা ফলাফল। প্রত্যেকদিন সন্ধ্যে বেলা যখন দেখি এই কোরোনা ধীরে ধীরে পুরো ইউরোপকে গ্রাস করছে, সারা বিশ্ব জুড়ে গণমৃত্যু হচ্ছে এবং ভারতেও থাবা বসাতে বদ্ধপরিকর তখন কপালের ভাঁজ বাড়তে থাকে। দমদমের সিঁথির বাড়ির কথা ভেবে, প্রিয়জনদের কথা ভেবে উদ্বেগ হয়। মনে হয় আর কয়েক সপ্তাহ পরে আমার নিজের দেশের চিত্রটাও এরকম মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে না তো! তাই যথা সম্ভ সোশ্য়াল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে বাড়িতে থাকতে অনুরোধ করছি।

মানুষ আশায় বাঁচে। আর আমিও এই কোয়ারেন্টাইনে থেকে কয়েকটা ভালো দিক শেষ কিছুদিনে আবিষ্কার করেছি। ‘দেশেবিদেশে’ থেকে শুরু করে সমসাময়িক ‘দা আইজ অফ ডার্কনেস’ এর মতো অনেক গুলো জমিয়ে রাখা বই পড়া হয়েছে। এসএপি ‘আর ‘ওরাকেল’ এর তুল্যমূল্য বিচার থামিয়ে ঘনাদা, অর্জুন সমগ্রে নিজেকে পুনরায় ডুবিয়েছি। নতুন ৭টা রেসিপি চেষ্টা করেছি। পুরনো কিছু বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা শুরু হয়েছে। বাড়ির সঙ্গে ভিডিও কলটা সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে নিয়ে এসেছি। আর সবথেকে ভালো লাগার ব্যাপার হলো সন্ধ্যে ৮ টার হাততালির মধ্যে দিয়ে হাজার হাজার নিঃস্বার্থ মানুষকে ধন্যবাদ জানানোর একটা ছোটো রাস্তা খুঁজে পেয়েছি। ও হ্যাঁ, বলা বাহুল্য সঙ্গীহীন আকাশটাও তার নিজের নীল রং আবার খুঁজে পেয়েছে, সে এখন বেজায় খুশি !!

তাই বর্তমানে এই বোবা মনের প্রত্যাশা দুটো। প্রথমটা হলো এই ঝড় যেন শীঘ্রই থেমে যায়। আর দ্বিতীয়ত,এই প্রচ্ছন্নমূলক ভালোলাগা আর ভালোরাখার দৃষ্টিভঙ্গি গুলো যেন সঙ্গে থেকে যায়।