সম্প্রতি কলকাতা সহ বাংলার বেশিরভাগ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ হয়েছে ভরতি প্রক্রিয়া৷ কিছু কিছু জায়গায় এখনও ভরতি প্রক্রিয়া চালু থাকলেও বেশিরভাগ আসনেই ভরতি হয়ে গিয়েছে৷ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে চালু হয়ে গিয়েছে ক্লাসও৷ সদ্য বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরানো পড়ুয়ারা নতুন স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া শুরু করেছেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে৷ কিন্তু, সেই স্বপ্নই দুঃস্বপ্ন হতে বেশি সময় লাগে না৷ নেপথ্যে ব়্যাগিং৷

প্রাথমিকভাবে মজার বিষয় হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বর্বরতার পর্যায়ে পৌঁছে যায় ব়্যাগিং৷ বর্তমান সময়ে ভারতবর্ষের কঠোর মনোভাবের কারণে অনেকটাই কমে এসেছে ব়্যাগিংয়ের ঘটনা৷ তবুও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে এসে যায় ব়্যাগিং-এর ভয়াবহ রূপটি৷ তবে, ব়্যাগিং মানেই যে তা মানসিক বা শারীরিকভাবে ক্ষতিকর তা নয়৷ বিভিন্ন ধরনের কাজকেই ব়্যাগিং আখ্যা দেওয়া যেতে পারে৷ তার মধ্যে কোনটি ব়্যাগিংয়ের ক্ষতিকর দিকে যাওয়ার সূক্ষ সীমা অতিক্রম করছে তা বুঝতে হবে পড়ুয়াদের৷ আর তা বুঝতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে আসলে ব়্যাগিং কী?

ব়্যাগিং শব্দের প্রচলিত অর্থ হল ‘পরিচয় পর্ব’। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা নতুন পড়ুয়াদের সঙ্গে সিনিয়র পড়ুয়াদের আলাপ-আলোচনা পর্বকেই মূলত ব়্যাগিং বলা হয়৷ কিন্তু, পশ্চিমী যে কোনও সংস্কৃতির মতোই আমরা তার ভালো দিকটাকে বর্জন করে খারাপ দিকটাকেই আপন করে নিয়েছি৷ ব়্যাগিংয়ের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নেই৷

অনেকের মতে, ব়্যাগিংয়ের সূত্রপাত হয়েছিল গ্রিক সংস্কৃতিতে৷ বলা হয়, মাঠে টিম স্পিরিট নিয়ে আসার জন্য সপ্তম ও অষ্টম শতকে এই প্রথার আবির্ভাব হয়েছিল৷ অষ্টাদশ শতাব্দিতে পশ্চিমী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিশেষত, ইউরোপীয় দেশগুলিতে এই সংস্কৃতি প্রবেশ করে৷ ১৮২৮ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই ব়্যাগিংয়ের প্রচলন শুরু হয় পাই, আলফা, বিটা, গামা, কাপ্পার মতো বিভিন্ন ছাত্র সংস্থার হাত ধরে। এই সব সংস্থাগুলি সদস্যদের সাহসিকতার পরিচয় নিত৷ যা পশ্চিমী দেশগুলিতে হ্যাজিং নামে পরিচিত।

কালের বিবর্তনে এই সংস্কৃতি প্রবেশ করেছে আমাদের ভারতবর্ষেও৷ তারপর বহুকাল কেটে গিয়েছে৷ ব়্যাগিং ক্রমশ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে৷ নিজেদের সিনিয়রিটির প্রমাণ দিতে ব়্যাগিংয়ের নামে দিনের পর দিনে নতুন পড়ুয়াদের উপর অত্যাচার করে গিয়েছে সিনিয়ররা৷ বহু সময়েই এই ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে যেখানে ব়্যাগিংয়ে মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে অত্যাচারিত পড়ুয়া আত্মঘাতী হয়েছেন বা মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়েছেন৷

আর যারা ব়্যাগিংয়ের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারে? তারাই পরবর্তীকালে জুনিয়রদের ব়্যাগিংয়ে নেতৃত্ব দেয়। যারা ব়্যাগিং করে তাদের কাছে এটা মজা মনে হয়। আর যাঁরা ব়্যাগিংয়ের শিকার হন তাঁদের কাছে এই মজাই বিভিষিকা হয়ে দাঁড়ায়৷ কিন্তু, সব মজাই ব়্যাগিং নয়৷ সেটা সব সময় পড়ুয়ারা বুঝতে পারেন না৷ এটা বুঝতে গেলে তাঁদের জানতে হবে ব়্যাগিং কী কী ধরনের হতে পারে৷ আর কখন ব়্যাগিং ভালো আর খারাপের মাঝের সূক্ষ সীমাটিকে অতিক্রম করছে৷

১. জাস্ট মজা: কিছু ক্ষেত্রে সিনিয়ররা বিভিন্ন মজার প্রশ্ন করে থাকে৷ কোনও গান গাইতে বলেন৷ অথবা, কোনও গানে নাচতে বলেন৷ এ ছাড়া, কোনও কাজের চ্যালেঞ্জ দিয়ে পড়ুয়াকে সাহসিকতার পরিচয় দিতে বলেন৷ এই সব ক্ষেত্রে নিজেকে কিছুটা অপমানিত মনে হলেও প্রকৃত অর্থে তার কোনও ক্ষতিকারক দিক নেই৷ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষকে অপমানের সম্মুখীন হতে হয়৷ সেখানে যদি ‘চিকনি চামেলি’ গানে দু’টো ঠুমকা লাগানোকে অপমান বলে মনে করেন, তাহলে আগামী দিনের প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হলে তার মোকাবিলা কী করে করবেন?

তবে, এক্ষেত্রেও মাথায় রাখতে হবে আপনাকে জোর করে কিছু করানো হচ্ছে কী না৷ যদি জোর করা হয় তাহলে অবশ্যই এর ক্ষতিকারক দিক রয়েছে৷ কিন্তু, যদি আপনাকে কিছু মজার প্রশ্ন করে বা কোনও কাজ দিয়েও সেটা আপনি করবেন কি না তা আপনার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটা নিছকই মজা৷ আর এই ধরনের ব়্যাগিংয়ের ইতিবাচক দিক হল, এর মধ্য দিয়ে অজানা অচেনা একটা নতুন জায়গায় আপনি ওই প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠতে পারবেন৷

২. সিনিয়রিটি দেখানো: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় নিজেদের সিনিয়রিটি প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন সিনিয়ররা৷ আর তা প্রমাণ করার জন্য সদ্য আসা পড়ুয়ার থেকে ভালো কে আছে? এই সব ক্ষেত্রে তাদের কথা শুনে চুপচাপ চলে যাওয়াই ভালো৷ কারণ, প্রত্যুত্তর দিতে গেলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে৷ আর রইল তাদের উপযুক্ত জায়গা দেখানোর কথা? আরও কয়েকমাস যেতে দিন, নতুন থেকে পুরনো হন৷ তারপরও একই পরিস্থিতি বার বার দেখা দিলে পদক্ষেপ নেবেন৷ তবে, মনে রাখবেন৷ যদি, কোনও ভাবেই সিনিয়রিটি দেখাতে গিয়ে অভদ্র ব্যবহার করে বা শারীরিকভাবে নির্যাতনের পথ বেছে নেয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নেবেন৷ কারণ, ততক্ষণে তারা ব়্যাগিংয়ের ক্ষতিকর দিকে যাওয়ার সূক্ষ সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে৷

৩. মহিলাদের থেকে সাবধান: কিছু সময় দেখা যায় সিনিয়র কিছু দিদিদের দল আপনাকে আটকে প্রশ্ন করতে শুরু করবে৷ প্রশ্নের ধরন সাধারণ থেকে বিতর্কিতও হতে পারে৷ যেমন, বাড়িতে কে কে রয়েছেন? এই প্রশ্নের পরই হঠাৎ তারা প্রশ্ন করতে পারে তুমি কি মনে কর মহিলারা পুরুষদের থেকে ভালো? এই সব ক্ষেত্রে নিজেকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় না দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সঠিক উত্তর দিয়ে চলে যাও৷ এই উত্তর হল ‘আমি সমানাধিকারে বিশ্বাসী’৷ সাধারণভাবে এই ধরনের ব়্যাগিংয়ের কোনও ক্ষতিকারক দিক থাকে না৷

৪. মদ্যপের দল: হস্টেল বা কলেজ৷ যে কোনও জায়গাতেই মদ্যপের দলের হাতে পড়তে পারেন আপনি৷ এই সব ক্ষেত্রে খুব সাবধানে চলতে হয়৷ প্রথমেই চেষ্টা করতে হয় কাটিয়ে যাওয়ার৷ যেমন, কোনও গুরুত্বপূর্ণ ফোনের নাম করে সেই জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া৷ সেটা সম্ভব না হল চুপ থাকুন৷ কোনও প্রশ্ন করা হলে একটি কী দু’টি শব্দে উত্তর দিন৷ আর যদি পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায় তাহলে দৌঁড়ে পালান৷ যা এই সব ক্ষেত্রে হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি৷ পরিস্থিতি থেকে বেড়িয়ে কাউকে ঘটনাটি সম্পর্কে জানিয়ে রাখুন৷

৫. ক্ষতিকর মানুষ: কিছু মানুষের স্বভাবেই রয়েছে অন্যের জীবনকে নরকে পরিণত করা৷ তাদের নিজেদের জীবনে আনন্দ নেই তাই অন্যের আনন্দও এরা দেখতে পারে না৷ এই ধরনের সিনিয়ররাই জোর করে রাজনৈতিক নেতাদের পরিচয় মুখস্থ করানো থেকে বাবা-মা ও পরিবারের অন্যান্যদের বিরুদ্ধে গালিগালাজ, সবার সামনে উলঙ্গ হয়ে নাচতে বলা, সবার সামনে অশ্লীল বই পড়তে বাধ্য করা, যৌন অঙ্গভঙ্গী করতে বাধ্য করা, মলমূত্র খেতে বাধ্য করা, জামাকাপড় ছাড়া বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা, মাদকদ্রব্য সেবনে বাধ্য করা ইত্যাদী বহু ধরনের ব়্যাগিং করে থাকে৷

আর এই সব ‘দাদা-দিদি’দের নির্দেশ না মানলে? তখন আর কথা নয়, শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেও ছাড়ে না এই ধরনের লোকেরা৷ এদের থেকে সাবধান৷ কারণ, ব়্যাগিংয়ের প্রচলিত অর্থ বিকৃত হয়েছে এদের হাত ধরেই৷ এদের কারণেই নতুন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখতে গিয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠেন নতুন পড়ুয়ারা৷ এই ধরনের বা আপনার সহ্যসীমার বাইরে কোনও ঘটনা ঘটলে সেটা ক্ষতিকর ব়্যাগিং৷ এই সব ক্ষেত্রে অত্যাচার সহ্য না করে যে কোনও উপায়ে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসুন৷ তারপর কলেজ, বন্ধুবান্ধব, পরিবার, চেনা-পরিচিতদের জানান৷ চুপ করে না থেকে পদক্ষেপ নিন৷