ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীন রথ যাত্রা মাহেশের রথ। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন এই রথ যাত্রা সম্বন্ধে কিছু অজানা তথ্য ও ইতিহাস জেনে নিন

মাহেশের জগন্নাথ মন্দিরের উৎপত্তির ইতিহাস- ঐতিহাসিক মতে খ্রিস্টীয় ১৬ শতকে, শ্রী ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর হাতে এই রথ যাত্রা উৎসবের সূচনা হয়। শ্রী ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী ছিলেন একজন বাঙালি সন্ন্যাসী, যিনি পুরীতে গিয়েছিলেন তীর্থ করতে। সেখানে তিনি, পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দিরে, শ্রী জগন্নাথ দেবকে স্বহস্তে ‘ভোগ’ অর্পন করতে চান। কিন্তু পুরীর মন্দিরের পূজারীদের বাধায় তা হয়ে ওঠে নি। ভগ্ন হৃদয়ে ধ্রুবানন্দ অনশনে মৃত্যু বরণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

অনশনের তৃতীয় দিনে তিনি স্বপ্নে শ্রী জগন্নাথ দেবকে দেখতে পান ও তাঁর বাণী শুনতে পান। শ্রী জগন্নাথ তাঁকে বলেন বঙ্গে ফিরে, ভাগীরথী নদীর তীরে মাহেশ বলে একটি স্থানে উপাসনা করতে। সেখানে তিনি ধ্রুবানন্দকে একটি বৃহৎ ‘দারু-ব্রহ্ম’ (নিম গাছের গুঁড়ি) পাঠাবেন। যা দিয়ে ধ্রুবানন্দ যেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি নির্মাণ করে ভোগ প্রদান করেন। স্বপ্নাদেশ পেয়ে ধ্রুবানন্দ মাহেশে চলে আসেন ও উপাসনা করতে থাকেন।

অবশেষে এক ভয়ানক ঝড়-জলের রাত্রে, নদীতে ভেসে এক বিশাল দারু-ব্রহ্ম সেখানে আসে ও ধ্রুবানন্দ জলে ঝাঁপিয়ে পরে সেটিকে ডাঙায় তোলেন। সেই দারু-ব্রহ্ম দিয়ে তিনি মূর্তি নির্মাণ করেন ও মাহেশে জগন্নাথ দেবের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এরপরে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাস নিয়ে পুরী যাবার পথে মাহেশে আসেন। সেখানে জগন্নাথ মন্দির দর্শন করেন ও মাহেশের জগন্নাথ বিগ্রহ দেখে প্রথমে অজ্ঞান হয়ে যান ও পরে গভীর সমাধী নেন। ধ্রুবানন্দ তাঁকে মন্দিরের দায়িত্ব নিতে বলেন।

মহাপ্রভু তাঁর বদলে শ্রী কমলকার পিপলাই কে মন্দিরের দায়িত্ব দিতে বলেন। শ্রী কমলকার পিপলাই ছিলেন মহাপ্রভুর ১২ জন গোপালের ৫ম। ধ্রুবানন্দ, মহাপ্রভুর নির্দেশ মেনে তাই করেন এবং এর কিছু দিন পরেই ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর মৃত্যু হয়।

মাহেশের রথ যাত্রার উৎপত্তির ইতিহাস- শ্রী কমলকার পিপলাই বংশগত পরিচয়ে ছিলেন, সুন্দরবনের খালিজুলির জমিদারের পুত্র। তিনি নীতি শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য নবদ্বীপ যান ও শ্রী মহাপ্রভুর শিষ্য হন। তিনি মাহেশের জগন্নাথ মন্দিরের ৬৪জন মহান্তের প্রথম মহান্ত। শ্রী কমলকার পিপলাই ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের ও বিশ্বের ২য় প্রাচীন ও বাংলার সর্ব প্রাচীন, মাহেশের রথ যাত্রার সূচনা করেন।

শ্রী কমলকার পিপলাই, যে রথ নির্মাণ করিয়েছিলেন ও যে জগন্নাথ মন্দিরের মূল সেবায়েত ছিলেন, তার কোনটাই এখন আর নেই। বর্তমানে থাকা, মাহেশের জগন্নাথ মন্দিরটি ১৭৫৫ সালে, কলকাতার পাথুড়িয়াঘাটার শ্রী নয়নচাঁদ মল্লিক, ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করান।

মাহেশের বর্তমান রথ যাত্রায় ব্যবহৃত লোহার রথটি, দিওয়ান কৃষ্ণচন্দ্র বসু, ‘মার্টিন-বার্ন’ কোম্পানি কে দিয়ে নির্মাণ করান। বাংলা নবরত্ন স্থাপত্যশৈলী তে নির্মিত এই লোহার রথটিতে, ১২টি চাকা আছে ও রথটি ৫০ ফুট উঁচু।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV