বিশেষ প্রতিবেদন: নোট বাতিলের ধাক্কায় কোমর ভেঙে গিয়েছে কেএলও জঙ্গিদের৷ যে বিপুল পরিমাণ অর্থ তারা ভুটানের গোপন স্থানে জমা করে রেখেছে তার ব্যবহার আর সম্ভব নয়৷ সংগঠনের প্রধান আত্মগোপনকারী জীবন সিংহ এটা ভালভাবেই বুঝতে পেরেছেন৷ গোয়েন্দা দফতরের আশঙ্কা, প্রতিহিংসায় উত্তরবঙ্গে বড়সড় নাশকতা ঘটাতে পারে এই মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি৷
কত টাকা রয়েছে কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের? উত্তরটা আজও অজানা৷ ভুটানের জঙ্গলে সঞ্চিত সেই অর্থ উদ্ধার কি সম্ভব? উঠছে এই প্রশ্ন৷ তার থেকেও বড় প্রশ্ন কেএলও প্রধানের গতিবিধি নিয়ে৷ জীবন সিংহ কোথায় রয়েছেন? চট্টগ্রামের গোপন ঘাঁটিতে? উত্তরবঙ্গ সংলগ্ন বাংলাদেশের উত্তর অংশের কোথাও? মায়ানমারে নাগা জঙ্গিদের ঘাঁটিতে? নাকি উত্তর পূর্ব ভারতের কোনও ঠিকানায়৷
২০১৫ সালে মায়ানমারে ঢুকে ভারতীয় কমান্ডোরা গুঁড়িয়ে দেয় নাগা জঙ্গি নেতা এসএস খাপলাংয়ের জঙ্গি শিবির৷ সেই অভিযানে কেএলও প্রধান জীবন সিংহের মৃত্যু হয়েছে৷ প্রাথমিকভাবে এই তথ্য উঠে আসে৷  পরে অসমের জঙ্গি সংগঠন আলফা (স্বাধীনতাপন্থী) দাবি করে, কেএলও প্রধান জীবিত৷

jibon-singhaগোয়েন্দা দফতরের ধারণা, নাশকতার নতুন পরিকল্পনা করছেন জীবন সিংহ৷তার প্রয়োজন বিপুল অর্থের৷ অথচ ভুটানে লুকিয়ে রাখা অর্থ ব্যবহার করা সম্ভব নয়৷ ২০০৩-০৪ সালের অপারেশন অল ক্লিয়ারে ভুটানের মাটিতে কেএলও ঘাঁটি গুঁড়িয়ে গিয়েছে৷ ভারতীয় সেনার সাহায্যে এই অভিযানটি ছিল রাজকীয় ভুটান আর্মির প্রথম কোনও বড় পদক্ষেপ৷ দক্ষিণ ভুটানের চারটি জেলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কেএলও, আলফা (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম), এনএসসিএন (ন্যাশনাল সোশালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড) ও এটিটিএফ (অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স) জঙ্গিদের ঘাঁটি ধংস করা হয়৷ অভিযানে শতাধিক জঙ্গির মৃত্যু হয়৷ নিরুদ্দেশ জীবন সিংহের সংগ্রহে থাকা টাকাও অধরা থেকে যায়৷
যে ভাবে অর্থ সংগ্রহ করতেন জীবন সিংহ ?
২০১১ সালে রাজ্যের ক্ষমতায় আসে নতুন সরকার৷ তখন দার্জিলিং পার্বত্য এলাকায় পৃথক গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন তুঙ্গে৷ নেতৃত্বে বিমল গুরুংয়ের সংগঠন গোজমুমো(গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা)৷  গোয়েন্দা সূত্রে খবর, পাহাড়ে মোর্চার সাফল্যে সমতলে উৎসাহী হন পৃথক কামতাপুর আন্দোলনের স্রষ্টারা৷ প্রাচীন কামরূপ রাজ্যকে ফিরিয়ে আনতে এ এক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন৷ সশস্ত্র পথে সেই আন্দোলন চালাতে উৎসাহী হন জীবন সিংহ৷ উত্তর দিনাজপুর থেকে জলপাইগুড়ি পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা রাজ্যের চা বলয়ের দিকে নজর পড়ে কেএলও প্রধানের৷  ছোটবড় চা-বাগানের নিজস্ব কারখানা নেই৷  তারা কাঁচা চা পাতা দালালের মাধ্যমে ফ্যাক্টরিতে বিক্রি করে৷ অর্থ উপার্জনের এই দালালির পথটাই বেছে নেন জীবন সিংহ৷ বাছাই করা রাজবংশী যুবকদের এই কাজে নিযুক্ত করা হয়৷ প্রতি কেজির লাভের টাকার একটা অংশ থাকত পুঁজি হিসেব৷ আর একটি অংশ থাকত দালালিতে নিযুক্ত যুবকদের জীবনযাপনের জন্য৷ সংগ্রহের আর  একটা বড় অংশ চলে যেত জীবনের কাছে৷ ধীরে ধীরে পুঁজি বাড়তে থাকে কেএলও-র৷ শক্তিশালী সশস্ত্র আন্দোলন করতে জীবন সিংহ আলফার পাশাপাশি মণিপুরি জঙ্গি সংগঠন কাংলাইপাকের সঙ্গেও হাত মেলান৷ শুরু হয় উত্তরবঙ্গকে রক্তাক্ত করার এক প্রতিহিংসার পর্ব৷ যার কেন্দ্র হিসেবে দক্ষিণ ভুটানের চারটি জেলার দুর্গম অংশে শিবির তৈরি করেছিল কেএলও৷
উত্তরবঙ্গ সংলগ্ন নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশের সীমান্ত আছে৷ সেই সুযোগটি নেন জীবন সিংহ৷ ভারতে নাশকতা চালিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলিতে চলে যাওয়া খুবই সহজ৷ সেই পথই নেয় কেএলও৷গোয়েন্দাদের ধারণা, অপারেশন অল ক্লিয়ার এই চক্র ভাঙতে পারলেও উদ্ধার হয়নি কেএলও-র মজুত অর্থরাশি৷ ভুটানে পড়ে থাক বিপুল টাকার শোক ভুলতে পারেননি জীবন সিংহ৷ টাকা বাতিলের ধাক্কা কামতাপুরি জঙ্গি নেতাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে৷

আরও পড়ুন:বিপাকে মাওবাদীরা! নষ্ট করল ৭০০০ কোটির নোট